প্রিন্ট এর তারিখঃ জুলাই ২৯, ২০২৬, ৮:৩০ পি.এম || প্রকাশের তারিখঃ আগস্ট ১, ২০২৫, ১০:৫৪ অপরাহ্ণ

জেলা প্রতিনিধি, লক্ষ্মীপুর : বড় আশা করে ঘর বাঁধেন মেঘনাতীরের মানুষ। সেই ঘর ভেঙে নিয়ে যায় সর্বনাশা ঝড়। সেই ঘরের ভেতরই হারিয়ে যায় ছেলে-মেয়ে, সংসার। নদীর চরে চরে তাদের খুঁজে বেড়ান এই সংগ্রামী মানুষ। জীবনের নিয়মেই আবার নতুন করে বাঁধেন ঘর। আবারও মেঘনার তীর ভাঙে। এভাবেই চলতে থাকে আলাউদ্দিনদের জীবন।
ষাটোর্ধ্ব আলাউদ্দিন এখন ঘর বেঁধেছেন লক্ষ্মীপুরের রামগতি উপজেলার চর রমিজ ইউনিয়নের চর গোসাঁই গ্রামে। সেখানে স্ত্রী, তিন মেয়ে ও দুই ছেলেকে নিয়ে থাকেন। এক সময় চর আলগী গ্রামে থাকতেন আলাউদ্দিন। এ পর্যন্ত ৯ বার তিনি মেঘনার ভাঙনের শিকার হয়েছেন। তাই একরকম ভাসতে ভাসতে এখন খুঁটি গেঁড়েছেন চর গোসাঁই গ্রামে। সম্প্রতি ওই এলাকায় গেলে নিজের দুশ্চিন্তার কথা বলেন তিনি।
আলাউদ্দিনের জমিজিরাত না থাকায় অন্যের জমিতে শ্রমিকের কাজ করেন। সেই কাজ না পেলে ওঠেন নৌকায়। মাছধরা শ্রমিক হিসেবে যে আয় হয়, তা দিয়েই পরিবারের ভরণপোষণ করতে হয়। চর গোসাঁই গ্রামের যেখানে এখন আলাউদ্দিনের বসতি, সেখান থেকে মেঘনার দূরত্ব ৫০ গজের মতো। পাশে বেড়িবাঁধ না থাকায় প্রতিদিন জোয়ারে তাঁর ঘরে ওঠে কোমর সমান পানি। ফলে রান্নাবাড়া করাও কঠিন হয়ে পড়ে। যে কোনো সময় আবার মেঘনার ভাঙনের শিকার হতে হবে তাঁকে। আলাউদ্দিনের মতো হাজারো মানুষ গত কয়েক বছরে বসতভিটা, ফসলি জমি হারিয়ে সর্বস্বান্ত হয়েছেন।
গত ৭ বছরে উপজেলার পাঁচটি ইউনিয়নের অন্তত সাত কিলোমিটার মেঘনায় বিলীন হয়েছে। চলতি বর্ষায় প্লাবিত হয়েছে নতুন নতুন এলাকা। পাশাপাশি চলছে ভাঙন। তাদের আশঙ্কা, দ্রুত সময়ের মধ্যে বেড়িবাঁধ নির্মিত না হলে উপজেলার মানচিত্র থেকে মুছে যেতে পারে বেশ কয়েকটি গ্রাম।
এসব এলাকার বাসিন্দাদের দীর্ঘদিনের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে ২০২২ সালে মেঘনাতীরে টেকসই বেড়িবাঁধ নির্মাণে প্রকল্প নেয় পানি উন্নয়ন বোর্ড। প্রকল্পের আওতায় রামগতির বড়খেরী থেকে উত্তরে কমলগরের মতিরহাট পর্যন্ত ৩১ কিলোমিটার বেড়িবাঁধ হওয়ার কথা। এর মধ্যে রামগতিতে ১৮ কিলোমিটার ও কমলনগরে ১৩ কিলোমিটার পড়েছে। জিও ব্যাগ, ব্লক ফেলা ও মাটি ভরাটসহ ১০২টি প্যাকেজে কাজের ব্যয় ধরা হয় তিন হাজার ৮৯ কোটি টাকা। চলতি বছরের ডিসেম্বরে এই প্রকল্পের কাজ শেষ হওয়ার কথা। অথচ এখনও সিকিভাগ কাজও দৃশ্যমান হয়নি। এ পর্যন্ত অর্থ ছাড় হয়েছে মাত্র ৮০০ কোটি টাকা। স্থানীয় বাসিন্দারা এ কাজে পাউবো ও ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে গাফিলতির অভিযোগ তোলেন। তারা জানিয়েছেন, নানা ছুতো দেখিয়ে ধীরগতিতে চলছে কাজ।
চর রমিজ ইউনিয়নের বিবিরহাট বাজারের ব্যবসায়ী শাকিল রানার (২৯) ভাষ্য, দীর্ঘদিন ধরেই প্রকল্পটির কোনো অগ্রগতি নেই। কেন নেই তাও বলতে পারছেন না। ঠিকাদারের কোনো খোঁজ নেই। এমনকি কোনো প্রতিনিধিও নেই।
সপ্তাহ দুয়েক উপজেলার বড়খেরী, চর রমিজ, চর আলগী ও চর আলেকজান্ডার ইউনিয়নের বেশ কয়েকটি এলাকায় যান এই প্রতিবেদক। স্থানীয় লোকজনের কথায় জানা গেছে, পাউবোর কার্যাদেশ পেলেও ঠিকাদাররা বালু ও শ্রমিক সংকটের অজুহাত দেখিয়ে যথাসময়ে কাজ শুরু করেননি। কিছু অংশে বালু ভর্তি জিওব্যাগ ফেলা হলেও অন্য কাজ কিছুই হয়নি। ফলে প্রতিনিয়ত জোয়ারের পানিতে নিম্নাঞ্চল তলিয়ে যায়। বড়খেরী ইউনিয়নে দৃশ্যমান তেমন কোনো কাজই হয়নি। ফলে নদীভাঙনের মুখে রামগতি-লক্ষ্মীপুর আঞ্চলিক সড়কের বড়খেরীর অংশ পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে।
বড়খেরী ইউনিয়নের রঘুনাথপুরের বাসিন্দা তানসেন দাস (৩৫) বিদ্যালয়ের শিক্ষক। তিনি অভিযোগ করেন, ওই এলাকায় ঠিকাদার বালু ও শ্রমিক সংকটের কথা বলে কাজ শুরু করেননি। যে কারণে পুরো এলাকাই ভয়াবহ ভাঙনের মুখে পড়েছে। কয়েকটি বাড়ি নদীতে চলে গেছে। শুকনো মৌসুমেও কাজ না করে নানা অজুহাত দেখায় ঠিকাদারের লোকজন। এখন চলছে বর্ষার অজুহাত।
বড়খেরী ইউপির প্যানেল চেয়ারম্যান মো. মিজানুর রহমানের ভাষ্য, সময় মতো কাজ না করায় এ ইউনিয়নের গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা, ঘরবাড়ি, রাস্তাঘাট বিলীন হওয়ার পথে। দ্রুত বাঁধের কাজ শুরু না হলে পুরো ইউনিয়নই হারিয়ে যেতে পারে।
সামাজিক সংগঠন কমলনগর-রামগতি বাঁচাও মঞ্চের আহ্বায়ক অ্যাডভোকেট আবদুস সাত্তার পালোয়ান বলেন, বালু সংকটের অজুহাত দেখিয়ে সঠিক সময়ে সঠিক কাজ হয়নি। গত পাঁচ বছরে প্রকল্পটিতে প্রতি অর্থবছরে গড়ে ৬০০ কোটি টাকার বেশি বরাদ্দ দেওয়ার কথা ছিল। কিন্তু বাস্তবে সেই বরাদ্দ দেওয়া হয়নি। কাজের শুরু থেকেই স্থানীয় লোকজন সেনাবাহিনীর মাধ্যমে কাজটি বাস্তবায়নের দাবি জানিয়ে আসছিলেন। কিন্তু তা হয়নি। প্রকল্পের প্রতিটি লটের কাজে সমান্তরাল অগ্রগতি নেই। কোথাও জিওব্যাগের ডাম্পিং হচ্ছে, আবার কোথাও ব্লক ডাম্পিং হচ্ছে। আবার কোথাও এখনও কাজ শুরুই হয়নি।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে তিনটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের তিনজন প্রকৌশলী জানিয়েছেন, প্রকল্পের কার্যাদেশপ্রাপ্ত ৯৭টি লটের মধ্যে ৩৫টি লটে কোনো কাজ হচ্ছে না। এর মধ্যে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান এসএসইসিএলের সাতটি লটে দু-তিন ভাগ, এডব্লিউআরের পাঁচটি লটে দুই ভাগ, বিশ্বাস বিল্ডার্সের ছয়টি লটে দুই ভাগ, ইলেক্ট্রো গ্রুপের একটি লটে পাঁচ ভাগ শেষ হওয়ার পর প্রকল্পের কাজ বন্ধ। অন্যদিকে ওয়েস্টার্ন ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের ১৫টি লটে প্রায় ৪০ ভাগ শেষ হওয়ার পর থেকে কাজ দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ। এসব প্রতিষ্ঠানের কোনো কর্মকর্তা বক্তব্য দিতে রাজি হননি।
তবে কাজ দৃশ্যমান না হওয়ার তথ্য অস্বীকার করেন লক্ষ্মীপুর পাউবোর নির্বাহী প্রকৌশলী নাহিদ-উজ জামান খান। তাঁর দাবি, ইতোমধ্যে অনেক স্থানে বাঁধ দৃশ্যমান। ফলে ভাঙন এখন কোথাও নেই। বছরে কাজের জন্য মাত্র কয়েক মাস সময় পাওয়া যায়। এ কারণে কিছুটা বেগ পেতে হচ্ছে।