মাহবুবুর রহমান : সতের দশমিক এগারো বর্গ কিলোমিটারের নোয়াখালী পৌরসভা, ১৮৭৬ সালে এ পৌরসভার জন্ম। ১৪৭ বছরের পুরোনো প্রথম শ্রেণির এ পৌরসভাটি দীর্ঘদিন ধরে নানা সমস্যা জর্জরিত। যারমধ্যে বর্তমানে সবচেয়ে বেশি সমস্যা দেখা দিয়েছে সুপেয় পানির। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অবহেলা আর অব্যবস্থাপনার কারণে দীর্ঘ এ সময়েও কাটেনি পৌরবাসীর সুপেয় পানির সংকট। পৌরসভাটির মাত্র ৫৬ভাগ নাগরিক পৌরসভার পানির সংযোগ ফেলেও সেটি পর্যাপ্ত নয়। ফলে মধ্যবিত্ত পরিবারগুলো বাজার থেকে রিফাইন পানি এবং নিম্নবিত্তরা ফুঁটিয়ে ব্যবহার করছেন টিউবওয়েল বা পুকুরের পানি। এর বাইরে ৪৪ ভাগ পৌর বাসিন্দা রয়েছেন পানির সংযোগের বাহিরে। এতে করে আর্সেনিক সহ পানিবাহিত রোগে আক্রান্তের শংকায় পৌরবাসীর।
নোয়াখালী পৌরসভার তথ্যমতে, পৌর এলাকায় প্রায় ২ লাখ ২ হাজার নাগরিকের মধ্যে সাপ্লাই পানির সরবরাহ পাচ্ছেন ১ লাখ ১৩ হাজার। শতকরা হিসেবে যা ৫৬ শতাংশ। পৌরসভার নিবন্ধনকৃত ১৭ হাজার ৬১৫ টি বাসা-বাড়ির মধ্যে পানির সংযোগ রয়েছে ৬ হাজার ৪৩৫ টিতে। যারমধ্যে ১৮৯টি বাণিজ্যিক সংযোগ রয়েছে। প্রতিদিন পৌর এলাকায় ১৪ হাজার ঘনমিটার পানির চাহিদা থাকলেও পরিশোধন ক্ষমতা রয়েছে মাত্র ৮ হাজার ঘনমিটারের।
মাইজদী হাউজিং ও নোয়াখালী কলেজ এলাকায় দুটি পানির পরিশোধনাগার রয়েছে। পৌরসভা এলাকায় পরিশোধনযোগ্য পানির কোন উৎস না থাকায় ১০ থেকে ১২ কিলোমিটার দূরবর্তি এলাকার সালেহপুর ও একলাশপুর ইউনিয়ন এর ভূ-গর্ভস্থ স্থান থেকে এসব পানি ১২টি মোটরের সাহায্যে পরিশোধনাগারে আনতে হয়। পরে তা পরিশোধন শেষে ৬টি ওভারহেড ওয়াটার ট্যাংকের মাধ্যমে গ্রাহকদের মাঝে সরবরাহ করা হয়। এখানে যে পরিমাণ পানি পরিশোধন করা হয় তাই পৌরসবার গ্রাহকদের মধ্যে সরবরাহ করা হয়, চাহিদার তুলনায় এটি পর্যাপ্ত নয়।
পৌরসভার বিভিন্ন ওয়ার্ড ঘুরে বাসিন্দাদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, পানির পরিশোধনাগারের আশপাশের গ্রাহকরা পানি সরবরাহ কিছুটা ভালো পান, আবার তাও সবসময় না। তবে বেশি বিপাকে রয়েছেন সংযোগ পাওয়া পরিশোধনাগার থেকে দূরে থাকা গ্রাহকরা, পর্যাপ্ত পরিমাণ পানি না পাওয়ার অভিযোগ বেশির ভাগের।
অনেকেরই অভিযোগ, সরবরাহের পানি যতটুকুই ব্যবহার হোক প্রতিমাসে নির্দিষ্ট পরিমাণ বিল তাদের কাছ থেকে নেওয়া হচ্ছে। যে মাসে পানি কম আসে এবং কম ব্যবহার হয় সে মাসে যে বিল ঠিক একটু বেশি ব্যবহার হলেও একই ধরনের বিল প্রতিমাসে পরিশোধ করতে হয়। আবার পানি না পেয়ে অনেকেই বিল দিতে অপারগতা প্রকাশ করলে সঠিক সময়ে কর্তৃপক্ষ বিল না পেলে সংযোগ বিচ্ছিন্ন বিভিন্ন ভাবে হয়রানিও করেন। গ্রাহকদের অভিযোগ কর্তৃপক্ষের চাহিদা মতো বিল পরিশোধ করেও প্রয়োজন মতো পানি পাওয়া যাচ্ছে না, এ বিষয়ে একাধিকবার অভিযোগ করেও কোন সুফল মিলেনি। পৌরসভার সাপ্লাই পানির সুবিধা পর্যাপ্ত না হওয়ায় অনেকে বাধ্য হয়ে টিউবওয়েল বা পুকুরের পানি ফুটিয়ে পান করার কারণে আর্সেনিক সহ পানিবাহীত রোগের ঝুঁকি বাড়ছে।
মাইজদী হাউজিং এলাকার বাসিন্দা মোমেন আক্তার বলেন, দৈনন্দিন জীবনে পানি আমাদের একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। ঘুম ভাঙা ভোর থেকে রাতে ঘুমানোর আগ পর্যন্ত সবসময়ই পানির কম বেশি ব্যবহার রয়েছে। কিন্তু সপ্তাহে ৩-৪দিনের বেশি পৌরসভার পানি পাওয়া যায়না। কোনদিন সকালে বা বিকেলে পানি আসলেও তা পর্যাপ্ত না। ফলে অনেক সময় বাহির থেকে বা বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ করে ব্যবহার করতে হয়। প্রতিমাসে পানির জন্য পৌরসভাকে বিল দেওয়ার পর আবার অতিরিক্ত টাকা খরচ করে বাইরে থেকে পানি আনার ফলে অতিরিক্ত টাকা ব্যয় হচ্ছে আমাদের।
হাবিব উল্ল্যাহ নামের মাইজদী বাজার এলাকার বাসিন্দা জানান, মাঝে মাঝে টানা ৩ থেকে ৪দিন পৌরসভার পানি পাওয়া যায় না। তারপর আসলেও যে পরিমাণ পানির গতি থাকার তাও থাকেনা। যার ফলে মাসের অর্ধেকের বেশি সময় ধরে পানি নিয়ে কষ্ট করতে হয়।
মমিন উল্ল্যাহ নামের একজন জানান, আমাদের বাসার পাশে একটি টিউবওয়েল রয়েছে। ওই পানিতে আর্সেনিক আছে যেনেও পানি নিয়ে তা ফুঁটিয়ে প্রাণ করতে হচ্ছে। পৌরসভার যে গ্রাহকরা রয়েছেন তারই নিয়মিত পানি পাচ্ছেন না, আমরা নতুন করে আবেদন করে সংযোগ নিলে শুধু টাকাই দিতে হবে, কিন্তু প্রয়োজন মতো পানি পাবো না। তাই সংযোগের জন্য আবেদনও করছি না।
দেশের প্রথম শ্রেণির একটি পৌরসভায় বসবাস করে সুপেয় পানির এ সংকটকে স্বাভাবিক ভাবে নিচ্ছেন না পৌরবাসীরা। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ এ সমস্যা সামধানে দ্রুত প্রয়োজনী ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন বলে প্রত্যাশা ভুক্তভোগীদের।
পৌর এলাকায় পানির সংকটের বিষয়টি স্বীকার করে নোয়াখালী পৌরসভার পানি ও পয়ঃনিষ্কাশন বিভাগের সহকারী প্রকৌশলী মোহাম্মদ নুরুল আফছার বলেন, পৌরসভা প্রতিষ্ঠার পর থেকে এখানে সুপেয় পানি সরবরাহের কোনো ব্যবস্থা ছিলো না। পরবর্তীতে ১৯৯৫ সালে ডানিডার মাধ্যমে পানি সরবরাহের প্রক্রিয়া করা হয়, যা ২০০৫ সালে তিনটি ওভারহেডট্যাংকের মাধ্যমে সীমিত আকারে পানি সরবরাহ চালু করা হয়। ২০১৮ সালে পৌরসভার পানি সরবরাহ ও সেনিটেশন প্রকল্পের আওতায় আরও একটি পানি সরবরাহ ব্যবস্থা চালু করা হয়। আর এ দুটি প্রকল্পের মাধ্যমে পৌরসভার প্রায় ৫৬ভাগ বাসিন্দাকে পানির সংযোগ দেওয়া হয়েছে। কিন্তু পৌর এলাকায় পানির সোর্স না থাকায় ৫কিলোমিটার দূর সালেহপুর ও একলাশপুর থেকে পানি সংগ্রহ করে তা সংশোধন করতে আমাদের অনেক বেশি খরচ হচ্ছে। কিন্তু তাতে পর্যাপ্ত পানি সরবরাহ করা যাচ্ছে না।
তিনি আরও জানান, পৌরবাসীর পানি সরবরাহ নিশ্চিত করতে ভূগর্বের উপরিভাগের (সার্পেস ওয়াটার) পানি ব্যবহার করার জন্য মন্ত্রণালয়ে একটি চিঠি দেওয়া হয়েছে। ওই প্রকল্পটি বাস্তবায়ন হলে পৌরসভার শতভাগ বাসিন্দাকে আমরা পানি সরবারহ করতে পারবো বলে আশা করছি।