
স্টাফ রির্পোটার : বাংলাদেশ রোড ট্রান্সপোর্ট অথরিটি (বিআরটিএ) র জেলা অফিসের ঘুষখোর, দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তাদের মদতপুষ্ট দালালচক্রের দৌরাত্ম্য বেড়েছে।
এলাকার বিআরটিএ অফিসে দীর্ঘদিন ধরে কর্মরত কয়েকজন চিহ্নত অসাধু কর্মকর্তা ওই দালালচক্র নিয়ন্ত্রণ করে। এই অফিসের সেবাপ্রার্থীরা ওই দালাল চক্রের কাছে জিম্মি হয়ে পড়েছেন।
সূত্র জানায়, জেলার বিআরটিএ অফিসে যানবাহনের রেজিস্ট্রেশন, ড্রাইভিং লাইসেন্স, গাড়ির কাগজপত্র ও ফিটনেস পরীক্ষাসহ প্রায় সব কাজ ক্ষেত্রে সেবাপ্রর্থী সাধারণ জনগণ দালাল চক্রের কাছে হয়রানির পাশাপাশি প্রতারণার শিকার হয়। এতে সরকার নির্ধারিত যানবাহনের রেজিস্ট্রেশন ফি, ড্রাইভিং লাইসেন্সের ফি সহ সংশ্লিষ্ট কাজে সরকার নির্ধারিত ফি ‘র পরও অতিরিক্ত অর্থ ঘুষ দিতে হয় সেবপ্রার্থীদের। এই দুষ্টু প্রক্রিয়ার সবকিছুই হয় অফিসের একশ্রেণির অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারিদের নির্দেশনায়।
২০২২ সালের ঘটনা- জেলা বিআরটিএ অফিসের কর্মকর্তার বিরুদ্ধে গ্রাহকের ড্রাইভিং লাইসেন্স করিয়ে দেওয়ার নামে ঘুষ দাবি করায় দুদক হটলাইন-১০৬ আসা এক অভিযোগের প্রেক্ষিতে ১১ সেপ্টেম্বর জেলা দুদকের ৪ সদস্যের একটি এনফোর্সমেন্ট টিম অভিযান পরিচালনা করেছে। জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের নিচতলায় বিআরটিএ অফিস। ওই কার্যালয় থেকে গ্রাহক যানবাহন ও মোটরসাইকেল নিবন্ধন, যানবাহনের রুট পারমিট ও ড্রাইভিং লাইসেন্সের সেবা নিতে হয়। ড্রাইভিং লাইসেন্সের আবেদন ফি ৫১৮ টাকা।
লাইসেন্স ফি ২ হাজার ৬০০ টাকা। আর মোটরসাইকেল নিবন্ধন ফি ১২ হাজার থেকে ১৫ হাজার টাকা। অভিযোগ রয়েছে, বিআরটিএ’র কিছু অসাধু কর্মচারি ড্রাইভিং লাইসেন্সের জন্য ৭ হাজার থেকে ৮ হাজার এবং মোটরসাইকেল নিবন্ধনের জন্য ৪ হাজার থেকে ৫ হাজার টাকা ঘুষ হিসেবে অতিরিক্ত আদায় করছে। এছাড়া সিএনজিচালিত অটোরিকশার রেজিস্ট্রেশন করতে নির্ধারিত সরকারি ফি ব্যাংকে জমা দেওয়ার পরেও ৮ হাজার টাকা থেকে ১০ হাজার টাকা ঘুষ দিতে হয়। সিএনজি চালিত অটোরিকশার মালিকানা পরিবর্তন করতে নির্ধারিত সরকারি ফি ব্যাংকে জমা দেওয়ার পরেও ৩ হাজার টাকা ঘুষ দিতে হয়। ড্রাইভিং লাইসেন্সের জন্য পরীক্ষায় পাশ করতে নির্ধারিত সরকারি ফি ব্যাংকে জমা দেওয়ার পরেও ২ হাজার থেকে ৩ হাজার টাকা ঘুষ দিতে হয়। এসব অভিযোগ ভুক্তভোগীদের।
সোমবার সকাল ১১ টায় জেলা বিআরটিএ অফিসে গেলে দেখা যায়, এ অফিসের দালাল জহির, মিজান সৌরভ, মিনহাজ,আতিকুর রহমান,দেলোয়ার হোসেন ও ফারুক অফিসের চেয়ার টেবিল সমেত বসে দালালি করছে। সাংবাদিক উপস্থিতি খবর শুনে দালালরা চেয়ার টেবিল ছেড়ে অফিসের ভিতরে হাটাহাটি শুরু করে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বিআরটিএ অফিসের কথিত এক দালাল জানায়, এ অফিসের সহকারি পরিচালক ইঞ্জিনিয়ার আতিকুর রহমান দালালদের মুল হোতা, নিয়ন্ত্রক। ইঞ্জিনিয়ার আতিকুর দালাল মিনহাজ এর মাধ্যমে ঘুষের টাকা হাতায়। দীর্ঘ ১২ থেকে ১৫ বছর ধরে এই অফিসে প্রায় ৩০ জন দালাল- দালালী পেশায় আছে। যাদের কাজই হচ্ছে সেবা নিতে আসা সাধারণ জনগণকে হয়রানি করা। জানা যায় কয়েকজন দালাল স্থানীয় হওয়ায় সেবা নিতে আসা অধিকাংশ সাধারণজন ভয়ে প্রতিবাদ করেন না।
সোনাইমুড়ী উপজেলার বজরা ইউনিয়নের ছনগাঁও গ্রামের আক্কাছ আলীর ছেলে ওমান প্রবাসী শাহাবুদ্দিন জানান, গত ১০ নভেম্বর মাইজদীর YAMAHA হোন্ডা শোরুমে যান মোটরসাইকেল কিনতে। ২ লক্ষ ৯৯ হাজার টাকা দিয়ে মোটরসাইকেল ক্রয়ের পর শোরুম ম্যানেজার সাজ্জাদুর রহমান বলেন, তাদের সাথে জেলা বিআরটিএ ‘র কর্মকর্তাদের সাথে গোপন যোগাযোগ রয়েছে। যোগাযোগ থাকার ফলে মোটরসাইকেলটির কাগজপত্র ও ড্রাইভিং লাইসেন্স করতে ৩২ হাজার টাকা দিলেই তারা কাগজপত্র করে দেবে। তবে ওই প্রক্রিয়ায় সরকারি ফি ব্যাংকে জমা দিতে হবে এর অর্ধেক টাকা। বাকি টাকা কর্মকর্তা কর্মচারিরা ঘুষ নিবে। আর না হয় কাজ করবে না।
আরও এক ভুক্তভোগী, বাসের ড্রাইভার ফেরদৌস আলম। পার্শ্ববর্তী জেলা লক্ষ্মীপুরে তার বাড়ি। গত ৪ বছর আগে তার ড্রাইভিং লাইসেন্স হারিয়ে যায়। ড্রাইভিং লাইসেন্স হারিয়েছে মর্মে থানায় জিডি -ও করা হয়েছি্ো। এর পরে সে নোয়াখালীর ঠিকানা দিয়ে ড্রাইভিং লাইসেন্স করার জন্য জেলা বিআরটিএ অফিসে যোগাযোগ করলে ওই অফিসের দালাল সৌরভ নামের একজন ২০ হাজার টাকা ঘুষ দাবি করেছে।
ঘুষ-দুর্নীতির অভিযোগ বিষয়ে জেলা বিআরটিএ অফিসের হিসাব সহকারি মাসুদ আলম জানায়, এখন সব আবেদন অনলাইনে। তাই ঘুষ নেওয়ার কোন সুযোগ নেই। তবে কেউ যদি খুশি হয়ে কিছু দেয় তাহলে নিয়ে থাকেন।
অফিসের মটরযান পরিদর্শক মাহবুব রব্বানী বলেন, তিনি এইসব দালালদের চেনেন না, তিনি একটি মিটিংয়ে রয়েছেন বলে বিষয়টি এড়িয়ে যান।
জেলা বিআরটিএ সহকারি পরিচালক প্রকৌশলী আতিকুর রহমানের বক্তব্য নিতে তার অফিসে গিয়ে পাওয়া যায়নি। তার মুঠোফোনটিও বন্ধ রয়েছে।
আপনার মতামত লিখুন :