
সাব্বির ইবনে ছিদ্দিক, হাতিয়া : গ্রাম বাংলার ঐতিহ্যবাহী কুড়ে ঘরগুলো বিলুপ্তির পথে। আধুনিক দালান-কোঠার আধিপত্য এবং আর্থ-সামাজিক উন্নতির ফলে খড়ের ঘরগুলো এখন আর দেখা মেলে না। গ্রামীণ অঞ্চলে পরিবেশবান্ধব এসব ঘর গ্রীষ্মে শীলতা এবং শীতে কালে উষ্ণতা দেয়। খড়, শান, বাঁশ দিয়ে নির্মিত এই ঘরগুলো গ্রীষ্মের প্রখর তাপদাহে আরামে বসবাসে মানুষের কাছে জনপ্রিয় ছিল।
এক সময় কুড়ে ঘর সাধারণত বাংলাদেশের গ্রামীণ অঞ্চলে বেশি দেখা গেলেও বিশেষ করে নদী, হাওর, পাহাড়ি এবং উপকূলীয় এলাকায় বেশী দেখা যেত। এ ধরণের ঘর সাধারণত মাটির ভিঠির উপরে , বাঁশের, কাঠের বা অন্যান্য স্থানীয়ভাবে সহজলভ্য সামগ্রী দিয়ে তৈরি করা হয়। এটি গ্রামের মানুষের জন্য সাশ্রয়ী এবং সহজলভ্য আশ্রয়স্থল হিসেবে ব্যবহৃত বিশেষ করে যারা নিম্ন আয়ের জনগোষ্ঠিদের কাছে।
বর্তমানে খড়ের সহজলভ্যতা কমে যাওয়ায় এগুলো তৈরীকরণ ক্রমশ বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। অনেকের মতে হয়তো অদূর ভবিষ্যতে ঐতিহ্যবাহী এই ঘরগুলোর কথা মানুষের স্মৃতি থেকে মুছে যাবে এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্ম কেবল রূপকথায় এগুলোর উল্লেখ পাবে। কিছু মানুষ এখনো ঐতিহ্য হিসেবে দু-একটি খড়ের ঘর সংরক্ষণ করে রেখেছেন।
প্রায় অর্ধশতক বছর আগেও বাংলাদেশের গ্রামাঞ্চলে খড়, বাঁশ, এবং শান দিয়ে তৈরি দো-চালাও চৌ-চালা খড়ের ঘরগুলো সহজেই দেখা যেত। তবে আধুনিক নির্মাণশৈলী ও রুচির পরিবর্তনের ফলে এই ঘরগুলো এখন শুধুই স্মৃতি হয়ে যাচ্ছে।
এছাড়া অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি এবং নতুন নির্মাণ উপকরণের সহজলভ্যতা এই খড়ের ঘরের বিলুপ্তিকে আরও ত্বরান্বিত করেছে। মানুষ এখন ইট, বালি ও সিমেন্টের ঘরে থাকতে বেশি আগ্রহী। খড়ের ঘরে বসবাসের বেশ কিছু উপকারিতা রয়েছে, যা গ্রামের ঐতিহ্যবাহী বাসস্থানে বিশেষ গুরুত্ব বহন করে।
প্রাকৃতিক উপকরণ দিয়ে নির্মিত হওয়ায় তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে খড়ের ঘর গ্রীষ্মকালে শীতল এবং শীতকালে উষ্ণ থাকে। এর ছাউনির জন্য ঘরের ভেতরে তাপমাত্রা স্বাভাবিক থাকে, যা প্রাকৃতিক শীতলকরণ ব্যবস্থা হিসেবে কাজ করে। এটি চৈত্র এবং জ্যৈষ্ঠ মাসের গরমে আরামদায়ক পরিবেশ নিশ্চিত করে।
খড়, বাঁশ, ও শানের মতো প্রাকৃতিক উপকরণ দিয়ে তৈরি হওয়ায় খড়ের ঘরগুলো সম্পূর্ণ পরিবেশবান্ধব। এগুলো তৈরি এবং রক্ষণাবেক্ষণের জন্য কম সম্পদ প্রয়োজন হয়, যা পরিবেশের ওপর নেতিবাচক প্রভাব কমায়। প্রাকৃতিক উপকরণ দিয়ে তৈরি হওয়ার কারণে খড়ের ঘরে বসবাস স্বাস্থ্যকর, কারণ এতে রাসায়নিক উপকরণের ব্যবহার নেই এবং ঘরের ভেতরে সঠিক বায়ুচলাচল বজায় থাকে। তদুপরি খড়ের ঘর তৈরি ও রক্ষণাবেক্ষণের খরচ অনেক কম। স্থানীয়ভাবে সহজলভ্য উপকরণ ব্যবহার করে এগুলো নির্মাণ করা যায়, যা অর্থনৈতিকভাবে সুবিধাজনক।
কুড়েঘর ব্যবহারকারী চরকিং ইউনিয়নের কলেজ পাড়া গ্রামের কর্মকার বাড়ীর, দিপক চন্দ্র কর্মকার জানান, আমি যে ঘরে আছি এই ঘর বাংলাদেশ স্বাধীনের আগে তৈরি হয়েছিল। আফাজিয়া বাজারে কমপক্ষে ২শ থেকে ৩শ ঘর আছে। যার মধ্যে আমার ঘরটা শুধু খড় দিয়ে তৈরি। এই ঘরে আমার দাদা বাবা ব্যবসা করে গেছেন। এখন আমিও এই ব্যবসা করতেছি। আমার অর্থনৈতিক কারণে আমি এটা টিন দিয়ে তৈরি করতে পারিনি।
বড় কথা হচ্ছে আমি এখানে সারাদিন আগুনের মধ্যে কাজ করি,আমার ঘরে গরম অনুভব করি না। আমার কাছে মনে হয় না এবং এই ঘরে যত কাস্টমার আসে সবাই কাজ শেষ হয়ে গেলেও অনেকে ইচ্ছেমত বসে থাকেন এবং আমাকে বলে দাদা আপনার ঘরটাতে এত আরামদায়ক কেন? শুধু একটা সমস্যা প্রতিবছর উপরের চালের খড়গুলো পরিবর্তন করতে হয়।
হাতিয়া ডিগ্রি কলেজ ও হাতিয়া আর্দশ মহিলা কলেজের অধ্যাপক মো. এনামুল হক বলেন:হাতিয়া দ্বীপে গৃহ নির্মান সামগ্রী কাঠ, বাঁশ ও শনের সহজলভ্যতার কারণে এক সময় ধনী নির্ধন সফলে কাঠ বা বাঁশের কাঠামোর উপর ছনের ছাউনীখণ্ড দ্বি-চালা বা চৌ-চালা গৃহে বসবাস করতো। ধনবানদের এ সব বাসগৃহ ছিল শানদার। গরীবদের বাস গৃগ্রহ ছিল ক্ষুদ্র ও জীর্ণ কলেবরের। তাদের এ সব ঘুরছে খলা হতো কুঁটির বা কুড়ে ঘরের আধিক্য দ্বীপের সর্বত্র চোখে পড়তো। বৃটিশ যুগ, পাকিস্তানী যুগ এবং বর্তমানের বাংলাদেশ যুগ,দীর্ঘ এ সময়ের পরিক্রমীয় পরিবর্তনের হাওয়া এসে। লেগেছে হাতিয়া দ্বীপের জনজীবনেও এ পরিবর্তন রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রকে স্পর্শ করেছে যার অপরিহার্য। পরিনাম,এ দ্বীপ বার্সীর জীবন ও জীবিকার উল্লেখযোগ্য রূপান্তর ।
রূপান্তরের এ মমোঘ ধারায় আজ ধনশালীরা সংসার পেতেছে পাকা বা আধা পাকা দালানে। মার গরীবেরা ঢেউ টিনের ছাউনী যুক্ত গৃহে। হত দরিদ্রদের দুই একটা সেফেলে কুঁড়ে ঘর কোন কোন গ্রামে আজো খুজে পাওয় যাবে। সময়ের পরিসরে, এগুলোও একদিন অবলুপ্তির মাঝে হারিয়ে যাবে। ভবিষ্যতের ছেলে-মেয়েরা এক দিন যাদুঘরের ব্যাটে সংরক্ষিত কুঁড়ে ঘরের মিনিয়েচার দেখে জানবে কুঁড়ে ঘর দেখতে ঠিক কেমন ছিল।
আপনার মতামত লিখুন :