
উপজেলা প্রতিনিধি, হাতিয়া : হাতিয়ায় প্রাথমিক বিদ্যালয় সমূহে গণিত অলিম্পিয়াডের শিক্ষা উপকরণ সরবরাহের নামে অর্থ সংগ্রহ ও নানা অপকৌশলে শিক্ষকদের বেতনের টাকা হাতিয়ে নেওয়াসহ প্রাতিষ্ঠানিক অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসের বিরুদ্ধে।
বুধবার উপজেলার হাজি আলতাফ হোসেন, রহমানিয়া সরকারি প্রাথমিক ও চরঈশ্বর রায় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় সহ কয়েকটি প্রাথমিক বিদ্যালয় ঘুরে প্রধান শিক্ষকদের সাথে কথা বলে অভিযোগের সত্যতা পাওয়া যায়।
জানা যায়, ২০২৩- ২৪ অর্থবছরে প্রাথমিক বিদ্যালয় সমূহে স্লীপ বরাদ্দ থেকে গণিত অলিম্পিয়াডের শিক্ষা উপকরণ সরবরাহের নামে শিক্ষা অফিস হাতিয়ার ২২৭ টি বিদ্যালয় থেকে ৬ হাজার টাকা করে নিয়ে নেয়। অতিশয় নিম্নমানের উপকরণ, যা কিনা ২ হাজার টাকারও হবেনা। প্রাথমিক শিক্ষা অফিসের এমন অনিয়ম সহ প্রাতিষ্ঠানিক বিভিন্ন দুর্নীতি এখনো চলমান থাকার অসংখ্য তথ্য প্রমাণও পাওয়া গেছে।
হাতিয়া উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা (চলতি দায়ত্বি) মোঃ আঃ জব্বার টাকার বিনিময়ে অধীনস্থ সহকারী প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা এ.বি.এম. নুরেজ্জমানের হাজিরা স্বাক্ষর জালিয়াতির মাধ্যমে নৈমত্তিক ছুটি লিখে দেন।
মো: আ: জব্বার ১৪ ডিসেম্বর ২০২৩ হাতিয়াতে যোগদানের পর থেকেই তিনি এ সকল অনিয়ম করে আসছেন। তার অনিয়মের সহযোগী- উচ্চমান সহকারী কাম হিসাব রক্ষক (ইউডিএ) নাজিম উদ্দিন হাতিয়াতে যোগদানের পর থেকে উপজেলার বিভিন্ন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের দপ্তরী কাম প্রহরী (আউট সোর্সিং) পদে নিয়োজিত ৯৭জন কর্মচারীর বেতন বিল মাস শেষে উপজেলা হিসাব রক্ষণ অফিসে পাঠানোর কথা থাকলেও পরবর্তী মাসের ১৫ তারিখের পরেও পাঠানো হয় না বলে অভিযোগ করেন নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ভুক্তভোগী কর্মচারীরা।
তারা জানান, গত দুই মাস পার হয়ে গেলেও বেতন ভাতাদি এখনো তারা পাননি। বেতন সংক্রান্তে আমরা অফিসে গেলে আমাদেরকে মানুষের মতো আচরণ করা হয় না, অফিসের নানান জটিলতা দেখিয়ে নাজিম উদ্দিন আমাদেরকে হয়রানি করেন।
এদিকে, হাতিয়া উপজেলার পিটিআই (ডিপিএড/সিইনএড) প্রশিক্ষণ প্রাপ্ত প্রায় ৬০০ শিক্ষকের নিম্নধাপ থেকে উচ্চধাপে বেতন নির্ধারণ সহ বকেয়া বিল প্রদানের ক্ষেত্রে উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা, আ: জব্বার, সাবেক ভারপ্রাপ্ত শিক্ষা কর্মকর্তা এ.বি.এম. নুরেজ্জমান, উচ্চমান সহকারী কাম হিসাব রক্ষক (ইউডিএ.) নাজিম উদ্দিন ও শিক্ষা অফিসের হয়ে ঘুষ আদায়ের কাজে নিয়োজিত এজেন্ট- সহকারী শিক্ষক এনায়েতে রাব্বীর বিরুদ্ধে কোটি টাকা ঘুষ আদায় সংক্রান্তে সম্প্রতি এ পত্রিকা সহ কয়েকটি পত্রিকায় প্রতিবেদনও প্রকাশিত হয়।
সত্য ও বস্তুনিষ্ঠ এ প্রতিবেদনে যে সকল শিক্ষকদের মন্তব্যের জন্য কল করা হয়, ওই শিক্ষকদের অফিস কক্ষে একজন করে ডেকে এনে শিক্ষা কর্মকর্তা আ. জব্বার ও ইউডিএ, নাজিম উদ্দিন নানা কৌশলে ম্যানেজ করে- মন্তব্যের বিপরীতে অভিযুক্তদের পক্ষে লিখিত নেওয়ার চেষ্টা করা সহ বিভিন্ন অপকৌশল গ্রহণ করে। যা অনিয়মকারীদের অনিয়মগুলোকে ঢাকা দেওয়ার জন্য আরেকটি অপপ্রয়াস মাত্র।
সহকারী শিক্ষা কর্মকর্তা এ.বি.এম. নুরেজ্জমান ২০ জুন ২০২৩ হাতিয়াতে যোগদানের পর থেকে কর্মস্থলে উপস্থিতির ক্ষেত্রে নানাবিধ অনিয়ম করে আসছেন। প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের চতুর্থ প্রাথমিক শিক্ষা উন্নয়ন কর্মসূচির (পিইডিপি৪) আওতায় হাতিয়া উপজেলার বিভিন্ন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের নব নিয়োগপ্রাপ্ত ১৬ জন সহকারী শিক্ষকের ১৫ দিনব্যাপী প্রাক-প্রাথমিক প্রশিক্ষণের প ম ব্যাচের প্রশিক্ষণ ১৮ এপ্রিল, ২০২৪ শুরু হয়। উপজেলা রিসোর্স সেন্টারের (ইউআরসি) ইন্সট্রাক্টর আকবর হোসেন ও সহকারী শিক্ষা কর্মকর্তা এবিএম নুরেজ্জমান প্রশিক্ষকের দায়িত্ব পালন করে আসছিলেন।
২৫ এপ্রিল ছিল প্রশিক্ষণের অষ্টম দিন বৃহস্পতিবার। প্রশিক্ষক এবিএম. নুরেজ্জমান এদিন যথানিয়মে হাজিরায় স্বাক্ষর করে কর্তৃপক্ষের বিনানুমতিতে কর্মস্থল ত্যাগ করে নিজ বাড়িতে চলে যান। পরদিন (২৬ এপ্রিল) থেকে প্রশিক্ষণের ১৫ তম দিন ( ০২ মে) পর্যন্ত ০৭দিন প্রশিক্ষণে অনুপস্থিত থাকেন। নুরেজ্জামানের অনুপস্থিতিতে প্রশিক্ষক আকবর হোসেন একাই প্রশিক্ষণ পরিচালনা করেন। এরই মধ্যে ০২ মে থেকে প্রাক্-প্রাথমিক প্রশিক্ষণের শেষ হওয়ার পরের দিন (০৪ মে) পর্যন্ত ০৩দিন
সুপারিনটেনডেন্ট মাইজদী পিটিআই নোয়াখালীর ২৯ এপ্রিল, ২০২৪ তারিখে পত্র নং-৩৮.০১.৭৫০০.০০০.২৫.০০৮.২১-১৫৪ মোতাবেক তিনি পরিমার্জিত ডিপিএড. (বিটিপিটি) কার্যক্রমের মনিটরিং, মেন্টারিং ও মূল্যায়ন বিষয়ক প্রশিক্ষণের প্রশিক্ষণার্থী হিসেবে মাইজদী পিটিআইতে অংশগ্রহণ করেন। তিনি শিক্ষা কর্মকর্তা আ: জব্বারের সাথে যোগাযোগ রক্ষা করে প্রাক্-প্রাথমিক প্রশিক্ষণের প্রশিক্ষকের দায়িত্ব পালনের বিষয়টি গোপন রেখে মাইজদী পিটিআই প্রশিক্ষণে অংশগ্রহণ করেন।
দুই জায়গা থেকে পুরো প্রশিক্ষণ ভাতার টাকা নেওয়ার উদ্দেশ্যে প্রশিক্ষক নুরেজ্জমান প্রাক্-প্রাথমিক প্রশিক্ষণের উপস্থিতি না দিয়ে তিনি প্রশিক্ষণের হাজিরা খাতা খালি রেখে দেন।
সে অনুযায়ী তিনি প্রাক্-প্রাথমিক প্রশিক্ষণে ১ হাজার ২০০ টাকা উৎস কর কর্তন পূর্বক ১৫ দিনের প্রশিক্ষকের ভাতা বাবদ ১৫ হাজার টাকা ও মাইজদী পিটিআইতে ০৩দিনের প্রশিক্ষণে যাবতীয় খরচাদি বাবদ ৭২০ টাকা কর্তন পূর্বক ৮ হাজার ৮৭০ টাকা উঠিয়ে নেন।
দাপ্তরিক ডকুমেন্টস ও সংশ্লিষ্ট সূত্রে আরো জানা যায়, শিক্ষা কর্মকর্তা আ: জব্বারকে মাসোয়ারা দিয়ে বেশিরভাগ সময় সহকারী শিক্ষা কর্মকর্তা এবিএম. নুরেজ্জমান কর্মস্থলে উপস্থিত না থেকে প্রায়ই বৃহস্পতিবার সকালে হাজিরা খাতায় স্বাক্ষর করে কর্তৃপক্ষের বিনানুমতিতে কর্মস্থল ত্যাগ করে একই জেলার কবিরহাট উপজেলায় তার নিজ বাড়িতে চলে যান। একইভাবে ২৩ মে ২০২৪ (বৃহস্পতিবার) হাজিরা খাতা স্বাক্ষর করে ২৪ ও ২৫ মে, ২০২৪ (শুক্রবার-শনিবার) নিজ বাড়িতে সাপ্তাহিক ছুটি ভোগ শেষে খোলার দিন ২৬ ও ২৭ মে, ২০২৪খৃঃ কর্মস্থলে অনুপস্থিত থাকেন। মঙ্গলবার ২৮ মে, কর্মস্থলে এসে এই দিনের হাজিরা দিলেও শিক্ষা কর্মকর্তাদ্বয়ের দ্বন্দ্বের জেরে নুরুজ্জমান আগের মতো পেছনের তারিখের অনুপস্থিত দুই দিনের স্বাক্ষর দেওয়ার সুযোগ পায়নি।
ফলে ওই দুই দিনের ঘরে শিক্ষা কর্মকর্তা আ: জব্বার- সহকারী শিক্ষা কর্মকর্তা নুরেজ্জমানের হাজিরা খাতায় লাল কালি দিয়ে অনুপস্থিত দিয়ে দেন। আবার পরের সপ্তাহে ০৬ জুন, ২০২৪ খৃঃ বৃহস্পতিবার সকালে হাজিরা খাতায় স্বাক্ষর করে এই কর্মকর্তা একইভাবে নিজ বাড়িতে চলে যান। ০৯ জুন ২০২৪ রোববার অফিস খোলার দিন কর্তৃপক্ষের বিনানুমতিতে অনুপস্থিত থাকায় শিক্ষা কর্মকর্তা আ. জব্বার তাকে এদিনের ঘরেও লাল কালি দিয়ে অনুপস্থিত দেন।
এভাবে একাধিকবার চললেও এরই মধ্যে শিক্ষা কর্মকর্তারা নিজেদের দ্বন্দ্বের অবসান করলে আঃ জব্বার টাকার বিনিময়ে নিয়মবহির্ভূত শিক্ষক হাজিরা খাতায় অনুপস্থিতিকে মুছে সিএল ছুটি লিখে দেন এবং মাস শেষে এ.বি.এম. নুরেজ্জমানকে পুরো মাসের বেতন ভাতাদি দিয়ে দেন। অবৈধ ভাগবাটোয়ারা নিয়ে পূর্বে উভয় শিক্ষা কর্মকর্তার মধ্যে দ্বন্দ্ব থাকলেও বর্তমানে তাদের উভয়ের যোগসাজসে নানাবিধ অফিসিয়াল অনিয়ম চলে আসছে।
সহকারী শিক্ষা কর্মকর্তা এবিএম নুরুজ্জমান নৈমিত্তিক ছুটির বিষয়টি স্বীকার করলেও বাকী অভিযোগ সম্পর্কে তার জানা নাই বলে মন্তব্য করেন।
এ বিষয়ে হাতিয়া উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো: আ: জব্বার জানান, এটিইও নুরুজ্জমান ওই সময় চরের স্কুল সমূহে ভিজিটে থাকতে পারেন।
প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক (চঃদাঃ) (তদন্ত ও শৃংখলা) মো:হোসেন আলীর সাথে মুঠোফোনে কথা হলে তিনি জানান, আমরা অভিযোগ পেলে মহাপরিচালকের পরামর্শক্রমে তদন্ত সাপেক্ষে ব্যবস্থা নেব।
আপনার মতামত লিখুন :