
সাব্বির ইবনে ছিদ্দিক, হাতিয়া : হাতিয়ার প্রখ্যাত মানবিক চিকিৎসক বিমান চন্দ্র আচার্যের কথা সমাজে আজ খুব বেশি প্রয়োজন। শুধু একজন চিকিৎসক নন, তিনি ছিলেন মানবিক মূল্যবোধ ও নৈতিকতার এক অনন্য দৃষ্টান্ত। তাঁর চিকিৎসাজীবন, সমাজসেবা ও দর্শন মানুষকে শিখিয়েছে— পরিচয়ের ভিড়ে সবচেয়ে বড় পরিচয় হলো মানুষ হওয়া।
হাতিয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের উপ-সহকারী কমিউনিটি মেডিকেল অফিসার (স্যাকমো) বিমান চন্দ্র আচার্য্য জন্মগ্রহণ করেন ১৯৮৭ সালে, উপজেলার পুরানো চৌরঙ্গী বাজার সংলগ্ন চানন্দি ইউনিয়নে। তাঁর বাবা ননী গোপাল আচার্য্য এবং মা সবিতা রানী, যিনি ছিলেন গৃহিণী। চার ভাইবোনের মধ্যে বিমান ছিলেন পরিবারের সবচেয়ে ছোট সন্তান।
শিক্ষাজীবনে তিনি ছিলেন মেধাবী ও পরিশ্রমী। ২০০২ সালে সুখচর মফিজিয়া উচ্চ বিদ্যালয় থেকে এসএসসি সম্পন্ন করেন। পরে হাতিয়া দ্বীপ সরকারি কলেজ থেকে ২০০৪ সালে মাধ্যমিক পাশ করেন। এরপর নোয়াখালী কলেজ থেকেও উচ্চ মাধ্যমিক সমাপ্ত করে,ডিপ্লোমা শেষ করে, চিকিৎসা শিক্ষা অর্জনের পথে এগিয়ে যান।
পেশায় চিকিৎসক হলেও, বিমান চন্দ্র আচার্য্য শুধু ওষুধের প্রেসক্রিপশনেই সীমাবদ্ধ ছিলেন না। তিনি রোগীকে দেখতেন একজন মানুষ হিসেবে-যাঁর কষ্ট, দুঃখ ও বেদনা বোঝা দরকার। অর্থকে কখনো প্রাধান্য না দিয়ে মানবিক দায়িত্ববোধ থেকেই তিনি অসংখ্য গরিব-অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছেন। নিজের সীমাবদ্ধতার মধ্যেও তিনি চেষ্টা করেছেন সবার মুখে হাসি ফোটাতে।
ডাঃ বিমান চন্দ্র আচার্য্য বলেন, পেশায় তুমি যা হও, মানুষ হও আগে— এ উক্তির মাধ্যমে আমি বোঝাতে চেয়েছেন, সমাজে শিক্ষক, ডাক্তার, আইনজীবী, কৃষক বা শ্রমিক— যেই হোন না কেন, প্রথম দায়িত্ব মানুষ হওয়া। কারণ মানুষ না হলে কোনো পেশার মহত্ত্ব থাকে না। অন্যদিকে মানুষ হয়ে উঠলে প্রতিটি পেশাই সম্মানের আসনে উন্নীত হয়।
আজকের সমাজে পেশাগত পরিচয়ের আড়ালে অনেকেই মানবিক মূল্যবোধকে ভুলে যান। স্বার্থ, লোভ ও প্রতিযোগিতার কারণে মানুষ মানুষের পাশে দাঁড়াতে অনীহা প্রকাশ করে। ঠিক এই জায়গায় বিমান চন্দ্র আচার্য্যর দিকনির্দেশনা প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠে। তিনি শিখিয়েছেন— আগে মানুষ হতে হবে; তাহলেই প্রকৃত অর্থে অন্য সব পরিচয়ের মূল্য পাওয়া যায়।
হাতিয়ার প্রবীণ সাংবাদিক ইখতিয়ার হোসেন তুহিন বলেন, বিমান চন্দ্র আচার্য্যর এই উক্তি পেশায় তুমি যা হও, মানুষ হও আগে”— তাঁর এই দর্শন শুধু চিকিৎসায় নয়, সামাজিক উন্নয়নেও কার্যকর দিকনির্দেশনা। যদি প্রতিটি মানুষ তাঁর অবস্থান থেকে মানবিকতা অনুশীলন করে, তবে দারিদ্র্য, বৈষম্য ও অমানবিকতা অনেকাংশে কমে আসবে।
আজকের দিনে, যখন সমাজ ভোগবাদ, লোভ ও বিভাজনে আচ্ছন্ন, তখন বিমান চন্দ্র আচার্যের এই বাণী আরও বেশি প্রাসঙ্গিক। শিক্ষা, রাজনীতি, চিকিৎসা— জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে এই নীতি মেনে চললে সমাজে ন্যায় ও সৌহার্দ্য প্রতিষ্ঠিত হবে।
বিমান চন্দ্র আচার্যের দর্শন আমাদের জন্য এক আলোকবর্তিকা। তাঁর জীবন ও বাণী মনে করিয়ে দেয়— “পেশায় তুমি যা হও, মানুষ হও আগে।” কারণ মানুষ হওয়াই সবচেয়ে বড় অর্জন, আর সেই মানবিকতাই পারে একটি সুন্দর ও শান্তিময় সমাজ গড়ে তুলতে।
আপনার মতামত লিখুন :