প্রকাশিত: ৯ নভেম্বর, ২০২৪
সর্বশেষ আপডেট : ৯ নভেম্বর, ২০২৪

সোনাইমুড়ী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের ৩০ শতাংশ ডাক্তার অনুপস্থিত, ভোগান্তিতে রোগীরা

Oplus_131072

উপজেলা প্রতিনিধি,সোনাইমুড়ী:সোনাইমুড়ী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসকদের অনুপস্থিতিতে ব্যাহত হচ্ছে স্বাস্থ্য সেবা। বিভিন্ন সমস্যা নিয়ে আগত রোগীরা বঞ্চিত হচ্ছেন চিকিৎসা সেবা থেকে। অনেক চিকিৎসক স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের ডিজিটাল হাজিরা ও খাতায় সই করে ২-১ ঘন্টা রোগী দেখে চলে যাচ্ছেন প্রাইভেট হাসপাতালে। বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকেরা ১৫ দিনে একবার আসেন হাসপাতালে। ফলে সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা না পেয়ে রোগীরা দারস্থ হচ্ছেন বেসরকারি ক্লিনিকের। অনেকে দালালের খপ্পরে পড়ে অপচিকিৎসায় হচ্ছেন সর্বশান্ত।

সরকারি এক প্রজ্ঞাপনে জানা যায়, হাসপাতালে চিকিৎসকদের উপস্থিতি মনিটরিং করতে ২০১৪ সালে সারাদেশে বায়োমেট্রিক মেশিনের ব্যবস্থা করা হয়। তবে সেই পদ্ধতি কাজে আসছেনা সোনাইমুড়ী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে। প্রতিনিয়তই অনুপস্থিত থাকছেন চিকিৎসকেরা। বায়োমেট্রিক মেশিনে ফিঙ্গার প্রিন্টের মাধ্যমে হাজিরা দিলেও সেবা দেননা রোগীদের। সরকারি হাসপাতালে উপস্থিতি দিয়ে চলে যান প্রাইভেট হাসপাতালে।

রোগীদের অভিযোগ, এ হাসপাতালের মেডিসিন বিশেষজ্ঞ ডাক্তার তানজিনা, গাইনি বিশেষজ্ঞ ডাক্তার সোহানা সিকদার, শিশু বিশেষজ্ঞ ডাক্তার সুপর্ণা, শিশু বিশেষজ্ঞ ডাক্তার আমিনুল ইসলাম, এনেসথেসিয়া ডাক্তার অভি নিয়মিত অনুপস্থিত থাকেন। এসব বিশেষজ্ঞ ডাক্তারদের রোগীরা কখনোই এই হাসপাতালে দেখেননি। তাদের অনুপস্থিতিতে সহযোগিতা করেন হাসপাতালের উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডাক্তার ইসরাত জাহান।

শনিবার সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, মেডিকেল অফিসার ডাঃ ইফতেখার জরুরী বিভাগে, ডাঃ গোলাম আজম ১১৯ নাম্বার রুমে ও ডাঃ মাসুদ ১২০ নাম্বার রুমে আউটডোরের চিকিৎসা দিচ্ছেন। প্রায় ৩০০ রোগী চিকিৎসা নিতে এসেছেন হাসপাতালের আউটডোরে। মাত্র দুই জন চিকিৎসক রোগী দেখছেন। অসুস্থ রোগীরা দীর্ঘ লাইনে টিকিট কেটে চিকিৎসা নিতে দাড়িয়ে আছেন ঘন্টার পর ঘন্টা। অন্যান্য ডাক্তারদের রুমে ঝুঁলছে তালা। আবার সেবা দেওয়া এইসব চিকিৎসকেরা হাসপাতালে এসেছেন সকাল ১১ টায়। তারা হাসপাতালে ১ থেকে দেড় ঘন্টা রোগী দেখে চলে যান। ফলে অনেক রোগী চিকিৎসা না পেয়েই বাড়ি চলে যেতে বাধ্য হচ্ছেন।

দেখা যায়, ডাক্তার না আসায় রোগীর চাপে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ নোয়াখালী ম্যাটস এর ইন্টার্নি শেষ হওয়া শিক্ষার্থীদের দিয়ে রোগীদের চিকিৎসা দিচ্ছেন। এসব শিক্ষার্থীরা হাসপাতালের সরকারি স্লিপে ব্যবস্থাপত্র দিচ্ছেন রোগীদের। এসংক্রান্ত বিষয়ে বিভিন্ন গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশ হলেও টনক নড়েনি কর্তৃপক্ষের।

অনুসন্ধানে দেখা যায়, চলতি মাসের ৯ দিনে সোনাইমুড়ী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে গড়ে ৩০ শতাংশ চিকিৎসক অনুপস্থিত ছিলেন। দৈনিক সংখ্যার হিসেবে যা দাড়ায় প্রায় ২০ জনে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ওয়েবসাইটের তথ্য বলছে সোনাইমুড়ী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে মোট সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী রয়েছেন ৬৫ জন। এরমধ্যে নভেম্বরের এক তারিখে ৫০ জন, দুই তারিখে ১৩ জন, তিন তারিখে ১১ জন, চার তারিখে ১৩ জন, পাঁচ তারিখে ৬ জন, ছয় তারিখে ৯ জন, সাত তারিখে ১১ জন, আট তারিখে ৪৭ জন ও নয় তারিখে ১৫ জন অনুপস্থিত রয়েছেন। এছাড়া এই নয় দিয়ে সরকারি ভাবে ছুটিতে ছিলেন ৪২ জন কর্মকর্তা-কর্মচারী।

রোগীদের অভিযোগ, তারা সকাল নয়টা থেকে হাসপাতালের বহির্বিভাগে চিকিৎসা নিতে আসেন। টিকিট কেটে দীর্ঘ ১১টা পর্যন্ত লাইনে দাড়িয়ে থাকেন, পর দুই একজন ডাক্তার একে একে রোগী দেখেন। বাকি রুম গুলো বন্ধ থাকে ডাক্তার আসেনা। কখনো কখনো দীর্ঘ সময় ধরে লাইনে দাড়িয়ে থাকলেও ডাক্তার আসেনা। বাধ্য হয়ে চিকিৎসা ছাড়াই বাড়ি ফিরতে হয়। সরকারি নিয়ম অনুযায়ী হাসপাতালের অফিস সময় এবং বহির্বিভাগে সেবা প্রদানের সময় (শনিবার হতে বৃহস্পতিবার) সকাল ৮ টা হতে আরম্ভ করে বিকাল ২টা ৩০ মিনিট পর্যন্ত নির্ধারিত থাকলেও তার কোন তোয়াক্কা নেই চিকিৎসকদের। ডাক্তাররা নিজেদের ইচ্ছামত চিকিৎসা দেয় উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের এক কর্মচারী জানান, রোষ্টারের হিসেব অনুযায়ী প্রতিদিনই ডাক্তারেরা অনুপস্থিত থাকেন। তাদের অধিকাংশই বিভিন্ন বেসরকারি হাসপাতালে ও চেম্বারে রোগী দেখেন। বাইরে ডিউটি করা চিকিৎসকেরা বিশেষ সুবিধা পাওয়ার জন্য উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তাকে ম্যানেজ করে চলেন।

উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের আইটি সহকারী তারেক জানান, বায়োমেট্রিক পদ্ধতিতে বর্তমানে হাজিরা দিতে হয় সকল কর্মকর্তা-কর্মচারীদের। এই পদ্ধতিতে কারচুপি করার কোন সুযোগ নেই। যে সকল চিকিৎসকরা অনুপস্থিত থাকেন তাদের উপস্থিত দেখানোরও কোন ব্যবস্থা নেই।

সোনাইমুড়ী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসকদের অনুপস্থিত থাকার বিষয়ে তথ্য চাইলে উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডাঃ ইসরাত জাহান তথ্য দিতে অনীহা প্রকাশ করেন।

চিকিৎসকদের অনুপস্থিতির বিষয়ে বায়োমেট্রিক ও হাজিরা খাতার তথ্য চাইলে নোয়াখালী সিভিল সার্জন ডাঃ ইফতেখার মাসুম তথ্য অধিকার আইনে আবেদন দিতে বলেন। তিনি স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পাঠাবেন। সেখান থেকে অনুমতি দিলে তিনি তথ্য দিতে পারবেন। তবে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের চিকিৎসক অনুপস্থিতির বিষয়ে তিনি কোন মন্তব্য করেননি।

আরও পড়ুন