
মো. আসাদুল্যাহ মিলটন ; অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠনপ্রক্রিয়ার মাধ্যমে আশা করা যাচ্ছে ১৯৯০, ১৯৯৬, ২০০১ ও ২০০৮ সালের মতো গণতান্ত্রিক পরিবেশে আরেকটি নির্বাচন অত্যাসন্ন। জেলাসহ সারা দেশের মানুষ সে নির্বাচনে ভোট দেয়ার জন্য উন্মুখ হয়ে আছেন। তবে লক্ষ্যণীয় বিষয় হচ্ছে এরই মাঝে সার্চ কমিটি গঠন করে নির্বাচন কমিশন গঠন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে নির্বাচনী কার্যক্রমও লক্ষ্যণীয়।
আসন্ন নির্বাচন নিয়ে জেলার নানা শ্রেণী-পেশার মানুষের সঙ্গে আলাপ-আলোচনায় যেসব বিষয় উঠে এসেছে তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য বিষয় হচ্ছে- প্রথমত, স্বশিক্ষিত ও অর্ধশিক্ষিত দিয়ে কোনো মতেই শিক্ষিত সমাজকে শাসন করা যাবে না বলে মতামত ব্যক্ত করেন তারা। তাদের মতামত হচ্ছে ইউনিয়ন পরিষদ ও পৌরসভা নির্বাচনে একজন প্রার্থীকে কমপক্ষে এসএসসি বা এইচএসসি এবং জাতীয় নির্বাচনে একজন প্রার্থীকে কমপক্ষে এইচএসসি বা গ্র্যাজুয়েশন থাকতে হবে।
দ্বিতীয়ত, সদ্য নির্বাসিত ফ্যাসিস্ট হাসিনা সরকারের আমলে করা নির্বাচনসংক্রান্ত বিভিন্ন আইন-কানুন গুলো সংস্কার। কারণ নির্বাচনী আইন সংস্কার না হলে অতীতের ন্যায় ‘যেই লাউ সেই কদু’ পর্যায়েই থেকে যাবে নির্বাচনব্যবস্থা। এ কারণে নির্বাচন কমিশন আইন সংস্কার করে তারপর নির্বাচন দিতে হবে বলে জোর দাবি এ জেলার ভোটারদের। অন্যথায় দেখা যাবে পূর্বের ন্যায় টাউট-বাটপার-অশিক্ষিত-অর্ধশিক্ষিতরাই পুনরায় নির্বাচিত হয়ে সমাজে চাঁদাবাজি-রাহাজানির মতো নৈরাজ্যকর অবস্থা সৃষ্টি এবং শালিস-নালিশের নামে ওয়ার্ডে ওয়ার্ডে শুরু হবে এক অরাজক অবস্থা। এতে কিছু কিছু বিষয়ে সাধারণ জনগণ তাদের অধিকার বাস্তবায়নে হয়রানির শিকার হতে পারেন। মোদ্দাকথা, শিক্ষিতদের ওপর অর্ধশিক্ষিতদের কর্তৃত্ব মানতে নারাজ জেলাবাসী। অপরদিকে নির্বাচনী হলফনামা জমা দিতে গিয়ে আবার কেউ কেউ আছেন সমাজে নিজের সম্মান ধরে রাখতে জাল সনদ ব্যবহার করেন এবং নির্বাচনী বৈতরণী পার হতে ভবিষ্যতেও এসব জাল সনদ ব্যবহার করে নিজের অবস্থান পাকাপোক্ত করতে পারেন। তাই নির্বাচনসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সে ব্যাপারে সজাগ দৃষ্টি রাখতে হবে।
যদিও সংস্কার ও নির্বাচন নিয়ে বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনীতিতে আলোচনা চলছে। রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) বলছে, স্বল্প সময়ের মধ্যে নির্বাচন করতে হবে। নির্বাচনের পরে রাষ্ট্রীয় কাঠামোতে বেশ কিছু সংস্কারের প্রস্তাব দেয়া হয়েছে দলটির ৩১ দফায়। এর মধ্যে দ্বিকক্ষবিশিষ্ট আইনসভা তৈরি করা, তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থার পুনঃপ্রবর্তন, রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় ভারসাম্য আনা, পরপর দু’বারের বেশি প্রধানমন্ত্রী হতে না পারা এবং সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ সংশোধনের দফা রয়েছে। এ ছাড়া গণমাধ্যম কমিশন, প্রশাসনিক সংস্কার কমিশন, সংবিধান সংস্কার কমিশন, অর্থনৈতিক সংস্কার কমিশন গঠন ও নির্বাচন কমিশন সংস্কারের প্রস্তাব রয়েছে বিএনপির ৩১ দফায়। ২০১৭ সালে ‘ভিশন ২০৩০’, ২০২২ সালের ১৯ ডিসেম্বর ও ২০২৩ সালের জুলাই মাসে ৩১ দফা ঘোষণার মাধ্যমে বিএনপি কয়েক দফায় রাষ্ট্র মেরামতের প্রস্তাব দেয়। হাসিনা সরকারের বাধার মুখে বিএনপির ৩১ দফার প্রচারণা ছিল দলটির সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও কয়েকটি সেমিনার-কর্মশালায় সীমাবদ্ধ। সম্প্রতি বিএনপি নতুন করে বিভাগ ও জেলাগুলোতে ৩১ দফার প্রচারণা শুরু করেছে। মূলধারার সংবাদমাধ্যমেও বিএনপির সংস্কার প্রস্তাব নিয়ে আলোচনা হচ্ছে।
এরই মধ্যে অন্তর্বর্তী সরকারের পক্ষ থেকে সংবিধান সংস্কার কমিশন, গণমাধ্যম সংস্কার কমিশন, স্থানীয় সরকার সংস্কার কমিশন, স্বাস্থ্য খাত সংস্কার কমিশন, শ্রম সংস্কার কমিশন, নারীবিষয়ক সংস্কার কমিশনসহ ১৫টি কমিশন গঠন করা হয়েছে। এর মধ্যে বিএনপির ৩১ দফায় উল্লেখিত কিছু কমিশনও রয়েছে। তবে বিএনপির পাশাপাশি নাগরিক কমিটি ও জামায়াত- এই দুই রাজনৈতিক শক্তির সংস্কার প্রস্তাব ও আলোচনায় আসা দরকার। ক্ষমতায় গেলে জামায়াতের পররাষ্ট্রনীতি কী হবে, যুক্তরাষ্ট্র-ভারত-চীনের মতো দেশগুলোর সঙ্গে কী ধরনের রাষ্ট্রীয় নীতি মেনে চলবে, নারী ও সংখ্যালঘুদের অধিকার প্রশ্নে তারা কী অবস্থান নেবে, ব্যাংকিং খাতে কী পরিবর্তন আসবে, শরিয়াহ প্রতিষ্ঠার বিষয়ে তাদের অবস্থান কী ইত্যাদি বিষয়েও দলটিকে স্পষ্টভাবে বলতে হবে। এছাড়া সময় এসেছে সবগুলো রাজনৈতিক দলকে একটা বিষয় ভেবে দেখার- শিক্ষিতদের প্রাধান্য দিয়ে প্রার্থী নির্বাচন করার। নচেৎ আওয়ামী শাসনের মতো দুর্বৃত্ত শাসন কায়েম হবে। ধান্ধালীগের মতো অন্য দলের হুকুমাত কায়েম হয়ে সমাজে শুরু হবে নানা বিশৃঙ্খলা। যা সমাজহিতৈষী কেউ কামনা করেন না।
যে কোনো দেশের জনপ্রতিনিধিদের আচরণ সাধারণত নাগরিকদের প্রভাবিত করে থাকে। যেসব প্রতিনিধি আইন প্রণয়ন করেন, জনগণের সমস্যা সমাধানের দিকনির্দেশনা প্রণয়ন করেন, তাদের আচরণ যদি স্বাভাবিক ও উন্নতমানের না হয়, তাহলে বিব্রতকর পরিস্থিতির উদ্ভব হয়ে থাকে। জনপ্রতিনিধিদের আচরণ স্বাভাবিক ও ন্যায্য না হলে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া ভেঙে পড়ার আশঙ্কা দেখা দেয়। আমাদের দেশে প্রায়শই যে সমস্যাটি লক্ষ্য করা যায় সেটি হলো- নির্বাচিত প্রতিনিধিরা নির্বাচন-পরবর্তী তাদের আচরণ এবং ভূমিকা কিছুটা পরিবর্তন করেন। নির্বাচনের অব্যবহিত আগে যে ধরনের আচরণ এবং প্রতিশ্রুতি দিয়ে থাকেন জনগণের সামনে, ঠিক সে ধরনের আচরণ এবং প্রতিশ্রুতির ব্যত্যয় বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই ঘটে থাকে। নির্বাচিত অথবা জোরজবরদস্তি করে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের দায় বদ্ধতার আওতায় আনতে হবে। এ ব্যাপারে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের স্বেচ্ছাচারিতা বা দুর্নীতি রোধ এবং তাদের আয়-ব্যয়ের হিসাব দেয়াসহ জবাবদিহি নিশ্চিত করতে নানা ধরনের আইন রয়েছে। স্থানীয় সরকার জনপ্রতিনিধিদের পাশাপাশি জাতীয় নির্বাচনে সংসদের একটি বড় দায়িত্ব সংসদ সদস্যদের নিজেদের দায়বদ্ধতা নিশ্চিত করা।
সংবিধানের ৮৭ অনুচ্ছেদে সংসদ ও সংসদ সদস্যদের বিশেষ অধিকার ও দায়মুক্তির বিধান অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। জাতীয় সংসদের ‘কার্যপ্রণালি-বিধি’র ২২তম অধ্যায় (ধারা ১৬৩-১৭৬) ‘বিশেষ অধিকার’ সম্পর্কিত। কারো কার্যক্রমের দ্বারা সংসদ কিংবা সংসদ সদস্যদের অধিকার ক্ষুণ্ন হলে তা তাদের বিশেষ অধিকারের লঙ্ঘন বলে গণ্য হবে। সাধারণ নাগরিকরা যেমন তাদের বক্তব্য ও কার্যক্রম দ্বারা সংসদ ও সংসদ সদস্যদের অধিকার ক্ষুণ্ন করতে পারে (যেমন, সংসদ কর্তৃক তলব হওয়ার পর তাতে সাড়া না দেয়া কিংবা দলিল-দস্তাবেজ না দেয়া)। তেমনিভাবে সংসদ সদস্যগণের নিজেদের আচরণের মাধ্যমেও এ অধিকার ক্ষুণ্ন হতে পারে। যেমন, তারা যদি দুর্নীতি-দুর্বৃত্তায়ন তথা অসদাচরণে লিপ্ত হন, যা জনসম্মুখে প্রতিষ্ঠানের মর্যাদা হানি ঘটাবে, তাহলেও সংসদের অধিকার ক্ষুণ্ন হয়। ভারতসহ অনেক দেশেই অসদাচরণের অভিযোগে সংসদ সদস্যদেরকে সংসদ থেকে বহিষ্কারও করা হয়। উদাহরণস্বরূপ, অর্থের বিনিময়ে সংসদে প্রশ্ন উত্থাপন করার এবং এলাকা উন্নয়নের লক্ষ্যে প্রদত্ত বরাদ্দ থেকে কমিশন গ্রহণ ইত্যাদি অভিযোগে ২০০৫ সালে ভারতীয় লোক ও রাজ্যসভার ১১ জন সদস্যকে একযোগে বহিষ্কার করা হয়। স্থায়ীভাবে বহিষ্কার ছাড়াও, অসদাচরণের অভিযোগে তিরস্কার এবং সাময়িকভাবে বহিষ্কারের মাধ্যমেও সংসদ সদস্যদের শাস্তি প্রদান করা হয়। তাই নিজেদের সততা, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করাও সংসদের কার্যক্রমের অতি গুরুত্বপূর্ণ দিক।
আইন প্রণয়নের ক্ষেত্রে সংসদের কার্যকারিতা নির্ভর করে প্রণীত আইনের মানের ওপর। মানসম্মত ও যথাযথ আইন প্রণয়নের জন্য প্রয়োজন মাননীয় সংসদ সদস্যদের প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি। দুর্ভাগ্যবশত, আমাদের খুব কম সংসদ সদস্যই এ গুরুত্বপূর্ণ কাজের প্রস্তুতিতে সময় ব্যয় করেন। এমনকি অনেকের এ ব্যাপারে আগ্রহও নেই। তাই অনেকে আমাদের জাতীয় সংসদকে ‘রাবার স্ট্যাম্পিং’ প্রতিষ্ঠান বলে আখ্যায়িত করেন। সংসদ প্রণীত আইনগুলোর দিকে তাকালেই এ অভিযোগের সত্যতা অনেকাংশে দৃশ্যমান। যেমন, নবম জাতীয় সংসদ কর্তৃক প্রণীত স্থানীয় সরকার আইনগুলোর মধ্যে অনেক গুরুতর অসামঞ্জস্য রয়েছে।
আমাদের সংবিধানে অনেকগুলো বিষয়ে আইন প্রণয়নের কথা বলা হলেও, তা বাস্তবে রূপদান করা হয়নি। সংসদে যদি জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে বিতর্ক না হয়, তা হলেও সংসদকে কার্যকর বলা যাবে না। বিরোধী দলের উপস্থিতি ছাড়া যেমন এ বিতর্ক যথাযথভাবে অনুষ্ঠিত হওয়া সম্ভবপর নয়, বিরোধী দলের উপস্থিতিতেও তা নিশ্চিত করা যায় না। এ গুরুত্বপূর্ণ কাজটি যথাযথভাবে সম্পাদনের জন্য প্রয়োজন : মাননীয় স্পিকারের নিরপেক্ষতা, সরকারি দলের উদারতা ও সংসদ সদস্যদের যথাযথ প্রস্তুতি। দুর্ভাগ্যবশত, আমাদের ক্ষেত্রে এর অনেকগুলোরই অভাব রয়েছে। অতীতে অনেক জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয় সম্পর্কেই সংসদে আলোচনা করতে দেয়া হয়নি। এছাড়াও বক্তব্য প্রদানের ক্ষেত্রে সংসদ সদস্যগণ যদি পরস্পরের প্রতি গালিগালাজ কিংবা নেতা-নেত্রীদের বন্দনায় নিজেদেরকে লিপ্ত রাখেন, তাহলেও সংসদ কার্যকারিতা অর্জন করে না। সংসদীয় কমিটিগুলো সংসদের প্রাণ। এগুলোর মাধ্যমেই সরকারের স্বচ্ছতা-জবাবদিহি নিশ্চিত হয়। আমাদের সংবিধানের ৫৫(৩) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, ‘মন্ত্রীসভা যৌথভাবে সংসদের নিকট দায়ী থাকিবেন’। তাই কমিটিগুলোর সক্রিয়তার ওপরই সংসদের কার্যকারিতা বহুলাংশে নির্ভর করে। সংসদে প্রশ্নোত্তরের মাধ্যমেও সরকারের জবাবদিহি প্রতিষ্ঠিত হয়। এসব ক্ষেত্রে বিরোধী দলের সদস্যরাই বেশি সক্রিয় ভূমিকা পালন করে থাকেন।
আপনার মতামত লিখুন :