
মো. আসাদুল্যাহ মিলটন : যার জন্মে ধন্য হয়েছে নোয়াখালী জেলা, যিনি এ অঞ্চলের মানুষের প্রাণপুরুষ, যাকে নিয়ে মানুষ গর্ববোধ করেন তিনি হলেন- নিভৃতচারী মহাসাধক, যামানার কুতুব, ওলীয়ে কামেল মরহুম মাওলানা আব্দুস সোবহান (রহ.)। ইখলাসের কিংবদন্তী মহাপুরুষ, ইলমে দ্বীনের দেদীপ্যমান এক উজ্জ্বল নক্ষত্র হযরত মাওলানা আব্দুস সোবহান (রহ.) পরবর্তীতে ‘বাড়ির হুজুর’ নামেই এ জেলাবাসীর কাছে সর্বাধিক পরিচিতি লাভ করেন। তার হাতেই ১৯১৩ইং সালে প্রতিষ্ঠিত হয় উপমহাদেশের শ্রেষ্ঠতম ইলমী মারকাজ ঐতিহ্যবাহী নোয়াখালী ইসলামিয়া কামিল (অনার্স) মাদ্রাসা। নিজের প্রতিষ্ঠিত সেই মাদ্রাসায় আজ তিনি উপেক্ষিত।
যারা যুগে যুগে জীবনের সবটুকু শক্তি ও সামর্থ্য ব্যয় করে দিয়েছেন, তাদেরই একজন প্রচারবিমুখ জ্ঞানতাপস মাওলানা আব্দুস সোবহান বাড়ির হুজুর (রহ)কে দিন দিন তার প্রতিষ্ঠিত মাদ্রাসা থেকে মুছে ফেলার এক গভীর চক্রান্ত লক্ষ্য করা যাচ্ছে।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, মাদ্রাসার প্রধান ফটকে হযরত মাওলানা আব্দুস সোবহান [বাড়ির হুজুর] (রহ)-এর পরিবর্তে লেখা হয়েছে হযরত মাওলানা আব্দুস ‘সোহাব’ [বাড়ির হুজুর] (রহ.)। যা অত্যন্ত দৃষ্টিকটু। এ অঞ্চলের মানুষের হৃদস্পন্দন বাড়ির হুজুর (রহ.)-এর দোয়ার বদৌলতে আল্লাহপাক এ জেলার মানুষকে মেঘনার করাল গ্রাস থেকে রক্ষা করেছেন, সেই প্রিয় শায়েখের নামের বানান ভুল এটা কি গ্রহণীয়? এলাকাবাসী আশা করেন কর্তৃপক্ষ খুব দ্রুত প্রধান ফটকে লেখা ভুল নাম শুদ্ধ করে মরহুম বাড়ির হুজুর (রহ.)-এর প্রতি যথাযথ সম্মান প্রদর্শন করবে।
এছাড়াও মাদ্রাসার মসজিদের নামে পূর্বে ব্যবহৃত হতো বাড়ির হুজুরের মসজিদ। কিন্তু সেখানেও বাড়ির হুজুরকে উপেক্ষা করার মতো ঘটনা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। বাড়ির হুজুর শব্দটি ছোট করে লেখা হয়েছে। অথচ এই ‘বাড়ির হুজুর’ নামের উপর নোয়াখালী জেলাসহ বিভিন্ন জেলা থেকে আগত ব্যক্তিরা দান-খয়রাত করতেন। যা দিয়ে মসজিদ-মাদ্রাসার বিভিন্ন জরুরি প্রয়োজন মেটানো হতো।
উপমহাদেশের বিখ্যাত সাধক পুরুষ মরহুম মাওলানা আব্দুস সোবহান (রহ.) যেভাবে ‘বাড়ির হুজুর’ (রহ.) হয়ে উঠলেন : শায়েখের নাতিন জামাই চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগের প্রফেসর (অব.) ড. শাহ মোহাম্মদ শফিক উল্লাহ রচিত হযরত চাঁদশাহ ফকির ও উপকূলীয় দায়রাসমূহের ইতিহাস গ্রন্থ থেকে জানা যায়, বাড়ির হুজুর নিজ বাড়িতে পিতার নিকট প্রাথমিক শিক্ষা শেষ করে স্থানীয় মাদ্রাসায় লেখাপড়া করেন। পরে তিনি উচ্চ শিক্ষার্থে কলকাতা মাদ্রাসায় ভর্তি হন। সেখান থেকে কৃতিত্বের সাথে ফাজিল পাশ করে তিনি দেশে ফিরে আসেন। দেশে এসে তিনি আহমদিয়া হাই মাদ্রাসায় সিনিয়র শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ লাভ করেন। উক্ত মাদ্রাসায় ফুটবল খেলার চাঁদা নিয়ে মতানৈক্য হওয়ায় তিনি আহমদিয়া হাই মাদ্রাসার চাকরিতে ইস্তফা দিয়ে নিজের বাড়ির দরজায় ১৯১৩ইং সালে একটি কওমি মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা করেন। ধীরে ধীরে মাদ্রাসার শ্রেণী ও ছাত্রসংখ্যা বাড়তে লাগলো। জেলা শহরের দক্ষিণে ঠক্কর এলাকার বক্তার মুন্সির বাড়িতে প্রতিষ্ঠিত এ মাদ্রাসায় স্থান সংকুলান হচ্ছিল না বিধায়, তখন বাড়ির হুজুরের এক ভক্ত সোনাপুর গ্রামের হাজী আবদুস সামাদ (র.) মাদ্রাসাটি স্থানান্তরের জন্য সোনাপুর মৌজায় তার বাড়ির সম্মুখে বেশ কিছু ভূমি দান করেন। এরপর মাদ্রাসাটি মহব্বতপুর বক্তার মুন্সি থেকে ১৯২৪ইং সালে সোনাপুরের বর্তমান স্থানে স্থানান্তর করা হয়। স্থানান্তরের পর মাদ্রাসার উদ্বোধনী মাহফিলে ভারতের ফুরফুরার পীর মাওলানা আবু বকর সিদ্দিকিকে দাওয়াত দেয়া হয়। ফুরফুরার পীর সাহেব উক্ত মাহফিলে উপস্থিত হয়ে দোয়া-খায়ের করেন।
কালক্রমে এ মাদ্রাসাটিই নোয়াখালী ইসলামিয়া কামিল (অনার্স) মাদ্রাসায় রূপান্তরিত হয়। ১৯১৩ইং সাল থেকে ১৯৭০ইং সাল পর্যন্ত একাধারে অর্ধশতাব্দীরও বেশি সময় ধরে বাড়ির হুজুর (রহ.) এ মাদ্রাসাটির জীবন্ত প্রহরী ছিলেন। ইলম, আমল, তাক্বওয়াসহ সর্বদিকে তিনি অতুলনীয় হওয়া সত্ত্বেও মাদ্রাসার ইহতিমাম ও পরিচালনার দায়িত্ব অন্যের হাতে অর্পণ করে নিজে সাধারণ শিক্ষক হিসেবেই ইলমে দ্বীনের খিদমতে সারাজীবন ওয়াক্ফ করে দেন।
বাড়ির হুজুর (রহ.)কে চিনতে হলে তার হাতে গড়া ছাত্রদেরকে চিনতে হবে। হুজুরের সান্নিধ্য পেয়ে যারা আজ স্বমহিমায় বিশ্বের সেরা শায়খ-মাশায়েখ, মুহাদ্দিস, মুফাসসির, আদীব, ফকীহ, ওয়ায়েজ, গবেষক, লিখক, সাহিত্যিক হয়ে উঠেন। এ বিরাট কাফেলায় যাদের নাম উল্লেখ না করলেই নয়, তারা হলেন- ১. মাওলানা আশরাফ আলী (র.), সাবেক শিক্ষামন্ত্রী, পাকিস্তান; ২. মাওলানা মোহাম্মদ ইদ্রিছ সন্দ্বীপী (র.), প্রতিষ্ঠাতা- মাদানীনগর মাদ্রাসা, ঢাকা; ৩. মাওলানা দেলোয়ার হোসাইন (র.) পীর সাহেব, ফেনুয়া; ৪. মুফতি সাইফুল ইসলাম (র.), হাতিয়া, নোয়াখালী; ৫. মাওলানা নুরুল হুদা (র.), মুহতামিম- চৌমুহনী ইসলামিয়া আরাবিয়া মাদ্রাসা; ৬. ওলিয়ে কামেল মাওলানা মোবারক করিম (র.), পীর সাহেব, উজানী; ৭. মাওলানা হাফিযুল্লাহ ‘যাদৈয়ার হুজুর’ (র.), সাবেক অধ্যক্ষ- টুমচর মাদ্রাসা, লক্ষ্মীপুর; ৮. মাওলানা সাইয়্যেদ আহমদ (র.) বড় হুজুর- ভাঙ্গা খাঁ, লক্ষ্মীপুর; ৯. মাওলানা সাঈদুল হক (র.), সাবেক মুহতামিম- কলাকোপা মাদ্রাসা, লক্ষ্মীপুর; ১০. মাওলানা সাইয়্যেদ আহমত দা. বা., মুহতামিম- ওলামা বাজার মাদ্রাসা; ১১. হাফেজ মাওলানা আব্দুল গণী (র.), সাবেক অধ্যক্ষ- নোয়াখালী ইসলামিয়া কামিল মাদ্রাসা; ১২. মাওলানা মোস্তাফা আল হোসাইনী দা. বা., প্রখ্যাত মুফাসসির- শায়খুল হাদিস, জামেয়া ওসমানিয়া, চাটখিল, নোয়াখালী; ১৩. মাওলানা আজিজুল্লাহ (র.), সাবেক অধ্যক্ষ- নোয়াখালী ইসলামিয়া কামিল মাদ্রাসা; ১৪. মাওলানা আব্দুল মালেক (র.), সাবেক অধ্যক্ষ- নোয়াখালী কারামতিয়া কামিল মাদ্রাসা; ১৫. মাওলানা আজীজুর রহমান দা. বা., সাবেক অধ্যক্ষ- নোয়াখালী ইসলামিয়া কামিল মাদ্রাসা; ১৬. মাওলানা আলী আহমদ দা. বা., সাবেক অধ্যক্ষ- টুমচর ইসলামিয়া ফাজিল মাদ্রাসা ও ১৭. মাওলানা নাছির আহমদ (নাছির সাহেব হুজুর), শায়খুল হাদিস, নোয়াখালী ইসলামিয়া কামিল মাদ্রাসা।
বাড়ির হুজুর (রহ.)-এর চালচলন ও জীবনযাপন ছিল খুবই অকৃত্রিম ও সাদাসিধে। পোশাক-পরিচ্ছদ ছিল একেবারেই মামুলী। তিনি নিজেকে অপরিচিত রাখার উদ্দেশ্যে সাধারণ পোশাক পরিধান করতেন। সাদা পোশাকই তার পছন্দনীয় ছিল। তিনি সর্বদা খড়ম পায়ে দিয়ে রাস্তার ডানপাশ দিয়ে মাথা ঝুঁকিয়ে নিম্নমুখী হয়ে চলতেন। কেউ সালাম দিলে মাথা তুলে জওয়াব দিতেন। জওয়াব শেষ হলে পুনরায় মাথা ঝুঁকিয়ে নিতেন। তিনি ছিলেন শামায়েল নববীর বাস্তব নমুনা।
এছাড়াও তিনি সদাসর্বদা আখিরাতের ধ্যানমগ্নতা ও ইবাদতবন্দেগীতে লিপ্ত থাকতেন। জিকরে ইলাহী থেকে কখনো তার জবান খালি থাকতো না। তাহাজ্জুদ, আওয়াবিন, এশরাক, চাশতসহ সব মাসনূন বিষয় ছিল তার দৈনন্দিন আমল। ছাত্রদেরকে জামাতে নামাজ আদায় ও তাকবীরে উলার জন্য খুবই তাগিদ দিতেন। সব ছাত্র সুবহে সাদেকের পূর্বে উঠে অন্ততঃ দু’চার রাকআত তাহাজ্জুদ নামাজ পড়তে পারে সে জন্য বারবার নিজের আকাক্সক্ষা ব্যক্ত করতেন। “যে ব্যক্তি সব চিন্তা বাদ দিয়ে আখিরাতের চিন্তায় মগ্ন থাকেন, আল্লাহ তায়ালা তার দুনিয়ার সমস্ত সমস্যা সমাধান করে দেন।” এ হাদিসের বাস্তব উপমা ছিলেন মাওলানা আব্দুস সোবহান (রহ.)।
মরহুম বাড়ির হুজুর (রহ.) আধ্যাত্মিকতার শীর্ষ স্থানে অধিষ্ঠিত ছিলেন। সুলুক ও তরিকতের সিলসিলায় তিনি ফুরফুরার বড় হযরত, ওলিয়ে কামেল আবু বকর ছিদ্দীক (র.)-এর হাতে বায়আত গ্রহণ করেন। ফুরফুরার হযরত তাকে খিলাফত দান করেন। তিনি মুস্তাজাবুদ দাওয়াত ছিলেন। সবসময় নিজেকে লুকিয়ে রাখার চেষ্টা করতেন। তিনি অতুলনীয় মেধাবী, বড় আদিব, নাহু-ছরফের ইমাম- এককথায় আল্লামা হওয়া সত্ত্বেও অন্যান্য উস্তাদগণকে উপরের কিতাবগুলো দিয়ে নিজে জামাতে হাপ্তুমের শ্রেণী শিক্ষক হিসেবে পুরো জীবন কাটিয়ে দেন।
অবশেষে নিভৃতচারী এ মহাসাধক ১৯৭০ইং সাল মোতাবেক ১৩৭৭ বাংলা সালের ফাল্গুনের মাঝামাঝি সোমবার দিবাগত রাত প্রায় ১১টায় প্রিয় প্রভুর সান্নিধ্যে পাড়ি জমান। বিরহ বেদনায় পুরো দেশ প্রায় পাগলপারা হয়ে যায়। সারা দেশ থেকে দলে দলে ওলামা-মাশায়েখ ও সাধারণ মানুষ ছুটে আসতে থাকেন। লাখো মানুষের উপস্থিতিতে পরদিন মঙ্গলবার বিকেল ৩টায় তার জানাযার নামাজ অনুষ্ঠিত হয়। আল্লাহ তায়ালা তাকে জান্নাতুল ফিরদাউসের সুউচ্চ মাকাম দান করুন। আমাদেরকে তার রেখে যাওয়া আমানতের যথাযথ হেফাজত করার তৌফিক দান করুন। আমিন।
তাই এ এলাকা তথা এ উপমহাদেশের গর্ব, অহংকার মরহুম হযরত মাওলানা আব্দুস সোবহান বাড়ির হুজুর (রহ.)কে তার প্রতিষ্ঠিত মাদ্রাসায় যথাযথ সম্মানের সাথে মূল্যায়নে সবাইকে সজাগ থাকতে হবে এবং যেখানে অবমূল্যায়নের চেষ্টা করা হবে, সেখানেই প্রতিবাদ-প্রতিরোধে সোচ্চার হতে কুণ্ঠাবোধ করবে না এলাকার সচেতন মহল।
আপনার মতামত লিখুন :