
হাবিবুর রহমান রনি, সুবর্ণচর উপজেলা প্রতিনিধি : গ্রামের কয়েক বাড়ির গভীর নলকূপে দৌড়েঝাপ করে কয়েক ঘন্টায় এক কলস সুপেয় পানি যোগাড় করতে পারিনি। ইফতারের মাত্র কয়েক মিনিট বাকি এখনো এক কলস সুপেয় পানি কোনো নলকূপ থেকে তুলতে পারিনি, ক্লান্ত কন্ঠে প্রতিবেদকে কতগুলো বললেন সুবর্ণচরের চরক্লার্ক ইউনিয়নের গৃহবধু আমেনা আক্তার। একবাড়ি থেকে অন্য বাড়ি কিন্তু কোথাও মিলছেনা সুপেয় পানি।
গত এক দশক ধরে নোয়াখালীর উপকূলীয় উপজেলা সুবর্ণচরের ৮টি ইউনিয়নের ৭২টি ওয়ার্ডে এখন একই চিত্র। চলতি মৌসুমে পুকুর খাল-বিল কোথাও নেই পানি। গৃহস্থালি কাজে বড়ই দুর্ভোগে এ জনপদের মানুষ।
এদিকে সুপেয় পানি না পেয়ে বাধ্য হয়ে কেউ কেউ গ্রহণ করছে অগভীর নল কূপের পানি এতে করে সল্প ও দীর্ঘ মেয়াদি স্বাস্থ্য ঝুঁকিতে রয়েছে এ অঞ্চলের বাসিন্দারা। সব থেকে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে শিশু, বৃদ্ধ ও গর্ভবতী নারীরা।
তথ্যমতে গত ১দশক ধরে,এঅঞ্চলে রবি মৌসুমে গাণিতিক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে বোরো উফসি জাতের ধানের চাষ। বৃষ্টির পানি সঞ্চয় না থাকায় কৃষকরা সেচ কাজে ব্যবহার করছে ভূগর্ভস্থ সুপেয় পানি। এতে করে পানির স্থর দ্রুত নিচে যাচ্ছে। ফলে সাধারণ গভীর নলকূপ থেকে সুপেয় পানি পাচ্ছে না মানুষ।
উপজেলা কৃষি সম্প্রাসারণ অধিদপ্তর জানায়, সুবর্ণচরে চলতি রবি মৌসুমে ৩৮ হাজার ৫শ হেক্টর আবাদি ভূমির মধ্যে ২০০০ সালে খালবিল ও পুকুরের পানি ব্যবহার করে মাত্র ২শ হেক্টর ভূমিতে বোরো চাষ হতো। বাকি ভূমিতে কৃষক রবি ফসলের আবাদ করতো। ২০০০ সাল থেকে ক্রমাগত হারে সুবর্ণচরে চলতি মৌসুমে শুধু ১৮ হাজার হেক্টর ভূমিতে বোরো ধানের চাষ করেছে কৃষক এবং ২ হাজার ৭৫০ হেক্টর ভূমিতে খেসারিসহ অন্যান্য ফসলের আবাদ করা হয়েছে। এই বোরো ধান চাষে ৫০ কোটি ১৬ লাখ ২০ হাজার ২৮০ কিউসেক পানি খরচ হচ্ছে। হেক্টর প্রতি ৪লাখ ১৪০ কিউসেক পানি খরচ হচ্ছে ধান চাষে। যা পানির মূলের সাথে ভয়ানক প্রতিযোগিতা। সেচ চাহিদার মাত্র ২০ ভাগ পানি ব্যবহার হচ্ছে উপরিভাগ থেকে।
বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশনের (বিএডিসি) তথ্য বলছে, সুবর্ণচরের চাষাবাদের জন্য ২৪৫টি গভীর নলকূপের (সেচপাম্প) অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। এছাড়াও ব্যক্তিগত উদ্যোগে অননুমোদিত আরও তিন হাজারের বেশি সেচ পাম্প স্থাপন করেছে কৃষক। প্রতিটি গভীর নলকূপ থেকে ভূগর্ভ হতে প্রতি ঘণ্টায় ১ হাজার ৮শ কিউসেক পানি উত্তোলন করছে কৃষক।
বিশেষজ্ঞদের মতে, অতিমাত্রায় ভূগর্ভের পানির ওপর নির্ভরশীলতায় ঝুঁকি বাড়াচ্ছে এ অঞ্চলে। বোরো (ইরি) ধান আবাদ কমিয়ে আনলে পানির সংকট ধীরে ধীরে কেটে যাবে। শুস্ক মৌসুমে ধান চাষাবাদে কৃষককে নিরুৎসাহিত করতে হবে। কৃষি কাজের জন্য প্রাকৃতিক পানির আধার সৃষ্টি করে দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে ভবিষ্যতে তা মহাবিপর্যয়ের কারণ হতে পারে। তারা আরও বলেন কৃষক যদি এই জমিতে সয়াবিন বা অন্য তৈল জাতীয় বীজ উৎপাদন করতো তাহলে সে তুলনামূলকভাবে বেশি লাভবান হতো।
এ বিষয়ে উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো হারুন অর রশিদ বলেন, আমরা সেচ কম লাগে এমন লাভজনক ফসল উৎপাদনে কৃষককে পরামর্শ দিচ্ছি। পাশাপাশি প্রকৃতিক পানির আধার সৃষ্টির লক্ষে সরকারের কাজে বিভিন্ন প্রস্তাব পাঠিয়েছি।এছাড়া পানি সংকট নিরসনের উপকূলীয় পরিবেশ রক্ষা আন্দোলন এর দাবির সাথে সহমত পোষণ করে দক্ষিণ সীমানায় মেঘনা লেকটি পূনরায় খনন করে সেচ কাজে ব্যবহার করার জন্য প্রস্তাব দিয়েছি।
উপকূলীয় পরিবেশ রক্ষা আন্দোলন নোয়াখালী এর সভাপতি আব্দুল বারী বাবলু জানিয়েছেন, এ অঞ্চলের কৃষি অর্থনীতি ও ভূগর্ভের সুপেয় পানি রক্ষায় খাল বিল, পুকুর ও দক্ষিণের মেঘনার মরা খাল পুনরায় খনন করে প্রাকৃতিক পানি সঞ্চয় করার কোনো বিকল্প নেই।
সুবর্ণচর উপজেলা নির্বাহী অফিসার সুরাইয়া আক্তার লাকী জানিয়েছেন, অবৈধভাবে স্থাপিত গভীর নলকূপের বিরুদ্ধে আইনগত পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
আপনার মতামত লিখুন :