প্রকাশিত: 3 May, 2025
সর্বশেষ আপডেট : 3 May, 2025

শৈশব হারিয়ে শ্রমের মাঠে সুবর্ণচরের শিশুরা

হাবিবুর রহমান রনি, সুবর্ণচর : সুবর্ণচরের আটকপালিয়া বাজারে প্রতিদিন বিকেলে এক ব্যতিক্রমী চিত্র চোখে পড়ে। এখানে শত শত মানুষ কাজের সন্ধানে ভিড় জমায়, যাদের মধ্যে অনেকেই শিশু। খেলার মাঠে বন্ধুদের সঙ্গে হাসি-আনন্দে মেতে থাকার সময়ে এই শিশুরা দাঁড়িয়ে থাকে শ্রমের হাটে-হাতে কাস্তে, মাথায় গামছা, চোখে জীবনের কঠিন বাস্তবতা।

দারিদ্র্য পরিবারের অস্বচ্ছলতা এবং জীবিকার তাগিদে ছোট্ট ছোট্ট হাতগুলো আজ কঠিন পরিশ্রমে অভ্যস্ত হয়ে পড়েছে। পড়ালেখা বা খেলাধুলার চেয়ে তাদের জীবনে এখন বেশি গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে, “আজ কাজ পাবো তো?”

এই শিশুদের অনেকেই দৈনিক ২০০-৩০০ টাকা মজুরিতে ক্ষেতখামার, নির্মাণসাইট বা ছোট হোটেল-চায়ের দোকানে শ্রম দিচ্ছে। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তারা ঝুঁকিপূর্ণ পরিবেশে কাজ করে, যা তাদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশের পথে বড় বাধা।

যদিও দেশে শিশুশ্রম নিষিদ্ধ এবং সরকার একাধিক কর্মসূচি চালু রেখেছে, বাস্তবচিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। স্থানীয় প্রশাসনের নজরদারির অভাব এবং সচেতনতার সংকট শিশুদেরকে প্রতিনিয়ত শ্রমের জগতে ঠেলে দিচ্ছে।

সুবর্ণচরের এই চিত্র শুধুই একটি উপজেলার বাস্তবতা নয়, এটি বাংলাদেশের বহু অঞ্চলের প্রতিচ্ছবি। যেখানে প্রতিদিন শৈশব হেরে যাচ্ছে টাকার কাছে, আর শিশুরা হারাচ্ছে তাদের সুন্দর ভবিষ্যতের সম্ভাবনা।

এই শ্রমের পেছনে নেই কোনো প্রশিক্ষণ, নেই সুরক্ষা, নেই শিশুবান্ধব পরিবেশ। শুধুই রুক্ষ বাস্তবতা। সুবর্ণচরের আরও কিছু এলাকায়, যেমন পূর্ব চরবাটা ছমির হাট, চরবাটা খাসের হাট, চরওয়াপদা থানার হাট, চরক্লার্কেও চলছে এমন মানবেতর দৃশ্য।

সুবর্ণচরের স্থানীয় সাংবাদিক আবদুল বারী বাবলু বলেন, ‘যে বয়সে লেখাপড়া আর খেলাধুলা করে মায়ের আঁচলের নিচে ঘুমানোর কথা। সেই বয়সে ওরা মহাজনের বাড়িতে ঘুমানোর সব প্রস্তুতি নিয়ে শ্রমের হাটে আসে। অন্যদিকে শিশু মজুরদের খাবার বা চিকিৎসার নিশ্চয়তা থাকে না। সূর্য ওঠার সঙ্গে সঙ্গে শ্রমিক শিশুরা মাঠে কাজের উদ্দ্যেশ্যে ছুটে যেতে হয়। মহাজনের ইচ্ছানুযায়ী কাজের তালিকায় থাকে ধান কাটা, রবি ফসলের ক্ষেত তৈরি, চারা রোপণ, পানি তোলা ছাড়াও নানা ধরনের কাজ। যা অনেক শিশুর জন্য অসাধ্য হয়ে ওঠে।’

স্থানীয় স্কুলশিক্ষক দেলোয়ার হোসেন জানান, “শিক্ষার বদলে শিশুরা যদি শ্রমে জড়ায়, তা জাতির জন্য ভয়াবহ সংকেত।” আইনজীবী আবুল হোসেন রাজু বলেন, “শিশু নিয়োগ শ্রম আইনে দণ্ডনীয় অপরাধ।”

সুবর্ণচর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা রাবেয়া আসফার সায়মা জানান, শিশুশ্রম বন্ধে প্রশাসন তৎপর, তবে এর বিরুদ্ধে সামাজিক প্রতিরোধ আরও জোরালো হওয়া জরুরি।

আরও পড়ুন