প্রকাশিত: 15 June, 2025
সর্বশেষ আপডেট : 15 June, 2025

আধুনিক সরঞ্জাম ও প্রয়োজনীয় সক্ষমতা না থাকায় চরম উদ্বেগ

মোহাম্মদ হানিফ, নিজস্ব প্রতিনিধি : গত দুই দশকে নোয়াখালীর নয়টি উপজেলায় ৫শ শতাধিক বহুতল ভবন গড়ে উঠলেও, অগ্নি নির্বাপণ ব্যবস্থার নাজুক অবস্থা এবং ফায়ার সার্ভিসের সীমিত সক্ষমতা জেলার বাসিন্দাদের মধ্যে তীব্র আতঙ্ক সৃষ্টি করেছে। বিশেষ করে বেগমগঞ্জ চৌমুহনী বাণিজ্য এলাকার মতো ঘনবসতিপূর্ণ স্থানগুলোতে অগ্নি নির্বাপণের কোনো ব্যবস্থা না থাকা এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলায় প্রয়োজনীয় সরঞ্জামের অভাবে যেকোনো বড় দুর্ঘটনার আশঙ্কা ক্রমেই বাড়ছে।

জেলা ফায়ার সার্ভিসের তথ্য অনুযায়ী, জেলার নয়টি উপজেলায় মোট দশটি ফায়ার স্টেশন থাকলেও, তাদের অগ্নি নির্বাপণের সক্ষমতা দোতলা ভবনের বেশি নয়। এর ফলে, নোয়াখালীর আকাশচুম্বী বহুতল ভবনগুলোতে আগুন লাগলে তা নেভানো প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়বে বলে আশঙ্কা করছেন স্থানীয়রা।

চৌমুহনী বাজারের ব্যবসায়ী আনোয়ার হোসেন ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “যেভাবে বহুতল ভবন উঠছে, তাতে ফায়ার সার্ভিসের কিছু করার আছে কিনা আমার সন্দেহ। আগুন লাগলে সব ছাই হয়ে যায়। আমাদের ফায়ার সার্ভিসগুলোর সেই সক্ষমতা নেই আগুন নেভানোর জন্য। ফায়ার সার্ভিস আদিকালের সেই পুরনো লক্কর-ঝক্কর জিনিস দিয়ে আগুন নেভাতে আসে। এটা দিয়ে কি আগুন নেভানো সম্ভব? তাদের যে গাড়িগুলো আছে, ১০ তলা বিল্ডিংয়ে আগুন লাগলে ফায়ার সার্ভিসের এরকম সক্ষমতা নেই।

চৌমুহনী বাজারের আরেক ব্যবসায়ী আবুল কাশেম বলেন, চৌমুহনী বাণিজ্যিক শহরে প্রতি বছর একাধিকবার অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। ফায়ার সার্ভিসের দুর্বলতার কারণে বছরে অর্ধশতাধিক দোকান পুড়ে ছাই হয়ে যায়। সামান্য আগুন লাগলেও তা দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে বাণিজ্যিক কেন্দ্র চৌমুহনীর কোটি কোটি টাকার ক্ষতির কারণ হয়। এর ফলে অনেক বড় ব্যবসায়ী ব্যবসা গুটিয়ে অন্যত্র চলে গেছেন। তিনি আরও যোগ করেন, ফায়ার সার্ভিসের সক্ষমতা এতটাই দুর্বল যে মুহূর্তে আগুন নেভানো বা তাদের সরঞ্জামের দুর্বলতার কারণে মুহূর্তের মধ্যে মার্কেট নিঃশেষ হয়ে যায়।

ব্যবসায়ী জামাল হোসেন মনে করেন, প্রতিটি বিল্ডিংয়ে অগ্নি নিয়ন্ত্রণের সরঞ্জাম রাখা উচিত যাতে আগুন লাগার সাথে সাথে নিজেরাই তা নেভানোর চেষ্টা করতে পারে এবং ব্যবসায়ীদেরও এ বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেওয়া প্রয়োজন।

রফিকুল ইসলাম নামের একজন স্থানীয় বাসিন্দা বলেন, ঘূর্ণিঝড় মোকাবিলায় ফায়ার সার্ভিসের সক্ষমতা প্রায় নেই বললেই চলে। এই জেলাটি আগুন এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে বেশি ঝুঁকিতে আসে। তিনি আরও জানান, ফায়ার সার্ভিসের কর্মকর্তারা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে উদ্ধার অভিযানে গেলেও আধুনিক সরঞ্জামের অভাবে তাদের কাজ কঠিন হয়ে পড়ছে। উপকূলীয় এই জেলা প্রাকৃতিক দুর্যোগপ্রবণ হওয়ায় ছোট-বড় অনেক প্রাকৃতিক দুর্যোগের মুহূর্তে অন্য জেলার মুখাপেক্ষী হতে হয়। ঘূর্ণিঝড় বা বন্যায় উদ্ধার চালানোর মতো আধুনিক সরঞ্জামও ফায়ার স্টেশনগুলোতে নেই।

ফায়ার সার্ভিসের সীমাবদ্ধতা ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা জেলার ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের সহকারী পরিচালক মোহাম্মদ ফরিদ আহমেদ জানান, নোয়াখালীর জীর্ণশীর্ণ অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা সত্ত্বেও জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ফায়ার সার্ভিস কর্মীরা কাজ করেন। বড় ধরনের কোনো দুর্ঘটনা বা অগ্নিকাণ্ড সংঘটিত হলে আমাদেরকে যেভাবে উদ্ধার সামগ্রী প্রয়োজন, স্বাভাবিকভাবে কিছু আছে। তবে বিশেষভাবে আমাদের টিটিএল এবং স্তরকে গাড়িটা প্রয়োজন, যা এলাকার দুর্ঘটনা ও দুর্যোগ মোকাবেলা দ্রুত করবে।”

তিনি আরও জানান, গত এক বছরে নোয়াখালীর নয়টি উপজেলায় ২৬৮টি অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। এসব অগ্নিকাণ্ডে ফায়ার সার্ভিস ২১ কোটি ১৩ লাখ ৯০ হাজার টাকার মালামাল উদ্ধার করলেও, ক্ষতির পরিমাণ তার বহুগুণ বেশি ছিল। এই পরিস্থিতি জেলার বাসিন্দাদের মধ্যে গভীর উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে এবং ফায়ার সার্ভিসের আধুনিকীকরণ ও সক্ষমতা বৃদ্ধির দাবি উঠেছে। অবিলম্বে ফায়ার সার্ভিসের আধুনিক সরঞ্জাম সরবরাহ এবং কর্মীদের প্রশিক্ষণের মাধ্যমে নোয়াখালীর নাগরিকদের অগ্নি ও প্রাকৃতিক দুর্যোগ থেকে সুরক্ষা নিশ্চিত করার দাবি জোরালো হচ্ছে।

আরও পড়ুন