
মোহাম্মদ হানিফ, নিজস্ব প্রতিনিধি : সোনাইমুড়ীতে জমি সংক্রান্ত বিরোধের জেরে একটি দোকান জোরপূর্বক দখল করে ‘ইসলামিক পাঠাগার’ তৈরির অভিযোগ উঠেছে জামায়াতে ইসলামীর নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে। ভুক্তভোগী দোকান মালিক ও ভাড়াটিয়ার দাবি, আদালতে মামলা চলমান থাকা সত্ত্বেও ইউনিয়ন জামায়াতের আমির দলবল নিয়ে দোকানটি দখল করেছেন, যার ফলে তাদের ব্যাপক আর্থিক ক্ষতি হয়েছে।
সোনাইমুড়ী উপজেলার আমিশাপাড়া ভদ্রগাঁও এলাকায় জমি নিয়ে দীর্ঘদিনের বিবাদের জেরে একটি চাঞ্চল্যকর ঘটনা ঘটেছে। স্থানীয় বাসিন্দা ও দোকান মালিক মোহাম্মদ হারুন (৬০) এবং তার ভাড়াটিয়া মো. মাহফুজুর রহমান অভিযোগ করেছেন, জামায়াতে ইসলামীর নেতাকর্মীরা তাদের দোকান জোরপূর্বক দখল করে সেখানে একটি পাঠাগার তৈরি করেছেন। তাদের দাবি, এই জমি নিয়ে আদালতে মামলা চলমান রয়েছে, কিন্তু ইউনিয়ন জামায়াতের আমির আলাউদ্দিন তার কর্মীদের নিয়ে আইন অমান্য করে এই কাজটি করেছেন।
মামলার নথি ও স্থানীয়দের সাথে কথা বলে জানা যায়, ২০০৯ সালে জামায়াতের ইসলামিক পাঠাগারের জন্য তিন শতক জমি কেনা হয়েছিল মৃত ফজলুল হকের ছেলে সিরাজুল ইসলামের কাছ থেকে। তৎকালীন ইউনিয়ন জামায়াতের আমির তোফায়েল আহম্মেদ মাস্টার এই জমি কিনলেও সেখানে কোনো স্থাপনা নির্মাণ করা হয়নি।
ভুক্তভোগী মোহাম্মদ হারুন অভিযোগ করেন, গত ২০২৪ সালের ডিসেম্বর থেকে বর্তমান ইউনিয়ন জামায়াতের আমির আলাউদ্দিন এবং তার কর্মীরা মোহাম্মদ হারুনের জমি দখলের চেষ্টা শুরু করেন। একপর্যায়ে তারা হারুনের জমিতে নির্মিত দোকানের ভাড়াটিয়ার মালামাল বাইরে ফেলে দিয়ে দোকানটি দখল করে তালা লাগিয়ে দেন।
এই ঘটনার পর মোহাম্মদ হারুন আদালতে মামলা করলে আদালত সোনাইমুড়ী থানাকে বিষয়টি তদন্তের নির্দেশ দেন। এএসআই মো. ফরিদ উদ্দিনের তদন্ত প্রতিবেদনে মোহাম্মদ হারুনকে বিবাদমান জমির মালিক ও দখলদার হিসেবে নিশ্চিত করা হয়। গত ২৬ মে আদালত জামায়াতের আমির আলাউদ্দিনসহ সংশ্লিষ্টদের আদালতে উপস্থিত থাকার নির্দেশ দিলেও তারা তা অমান্য করেন।
বারবার দখল ও আর্থিক ক্ষতির অভিযোগ আদালতে বিবাদী পক্ষ উপস্থিত না হওয়ায় এবং থানা প্রতিবেদনে মোহাম্মদ হারুনের মালিকানা স্পষ্ট হওয়ায়, তিনি তার ভাড়াটিয়া মো. মাহফুজুর রহমানকে পুনরায় দোকানটি বুঝিয়ে দেন। কিন্তু দোকানটি বুঝে নেওয়ার কয়েক দিনের মধ্যেই আবার জামায়াতের নেতা-কর্মীরা মালামাল বাইরে ফেলে দিয়ে দোকানটি দখল করে নেন। অভিযোগ উঠেছে, বর্তমানে এই দখলকৃত দোকানে ‘ইসলামিক পাঠাগার’ নামের আড়ালে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালিত হচ্ছে।
দোকান মালিক মোহাম্মদ হারুন বলেন , যিনি অসুস্থ এবং একমাত্র আয়ের উৎস হিসেবে এই দোকানের ভাড়ার ওপর নির্ভরশীল, জানান যে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর থেকে জামায়াতের নেতাকর্মীরা তার দোকান দখলের চেষ্টা করছেন। তিনি বলেন, তারা সিরাজুল ইসলামের কাছ থেকে জমি কিনলেও পরিকল্পিতভাবে তার দোকানঘর দখল করছেন এবং তার ভাড়াটিয়ার মালামাল বাইরে ফেলে দিয়ে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি করেছেন।
ভাড়াটিয়া মো. মাহফুজুর রহমান, যিনি গত ১৫ বছর ধরে এই দোকানে ফার্নিচারের ব্যবসা করছেন এবং গত বছর ৩ লাখ টাকা অগ্রিম দিয়ে নতুন চুক্তি করেছিলেন, অভিযোগ করেন যে পরপর দুইবার তার সকল ফার্নিচারের মালামাল দোকান থেকে বাইরে ফেলে দেওয়া হয়েছে। রোদে পুড়ে ও বৃষ্টিতে ভিজে তার প্রায় পাঁচ লাখ টাকার ক্ষতি হয়েছে। তিনি তার চুক্তির ৩ লাখ টাকা ও ব্যবসায়িক ক্ষতি সামাল দিতে দিশেহারা বলে জানান।
অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে আমিশাপাড়া জামায়াতের আমির আলাউদ্দিন জানান, ২০০৯ সালে তারা ইসলামিক পাঠাগারের জন্য সিরাজুল ইসলামের কাছ থেকে জমি কিনেছিলেন। কিন্তু আওয়ামী সরকার ক্ষমতায় থাকায় তারা পাঠাগার তৈরি করতে পারেননি এবং জমি দীর্ঘদিন পড়ে ছিল। তিনি বলেন, বর্তমান সরকারের পতনের পর তারা জমি বুঝে নিতে গেলে তাদের কেনা তিন ডিসিম জমি বুঝে পাচ্ছেন না। এ বিষয়ে ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানের কাছে অভিযোগ করা হয়েছে এবং সরকারি আমিন মাপঝোঁক করার পর চেয়ারম্যান তাদের জমি বুঝিয়ে দিয়েছেন। তবে সিরাজুল ইসলামের কাছ থেকে জমি কিনে কেন তার ভাই মোহাম্মদ হারুনের দোকান দখল করা হয়েছে, এই প্রশ্নের কোনো সদুত্তর তিনি দিতে পারেননি। তিনি অবশ্য স্বীকার করেছেন যে জমি নিয়ে আদালতে মামলা চলমান রয়েছে।
আমিশাপাড়া ইউনিয়নের প্যানেল চেয়ারম্যান মো. জাহাঙ্গীর জানান, তিনি উভয় পক্ষের সাথে কথা বলে জমির বিষয়টি মীমাংসা করে দিয়েছিলেন। তবে ভাড়াটিয়াকে দোকান থেকে বের করে দেওয়ার বিষয়ে তিনি কিছু জানেন না। তিনি মন্তব্য করেন, যিনি ওই জমির ওপর থাকা দোকান ভাড়া নিয়ে ব্যবসা করতেন, তাকে অন্যত্র স্থান বদলির জন্য সময় দেওয়া উচিত ছিল।এই ঘটনাকে ঘিরে এলাকায় উত্তেজনা বিরাজ করছে এবং স্থানীয়রা এর দ্রুত সমাধান দাবি করছেন।
আপনার মতামত লিখুন :