
মোহাম্মদ হানিফ, সোনাইমুড়ী : সোনাইমুড়ী উপজেলার আমিশাপাড়া ও দেওটি ইউনিয়ন ভূমি অফিস পরিণত হয়েছে ঘুষ-দুর্নীতির অভয়ারণ্যে। অভিযোগ উঠেছে, কতিপয় কর্মকর্তা-কর্মচারী ও স্থানীয় দালালদের সমন্বয়ে এখানে একটি শক্তিশালী সংঘবদ্ধ চক্র গড়ে উঠেছে, যার হাতে জিম্মি হয়ে পড়েছে সাধারণ ভূমি সেবাপ্রার্থীরা। প্রকাশ্যে ঘুষ লেনদেন এবং প্রতিটি কাজের জন্য অতিরিক্ত অর্থ আদায় এখন যেন এক অলিখিত নিয়মে পরিণত হয়েছে, যা সাধারণ মানুষকে আর্থিক ও মানসিকভাবে নিষ্পেষিত করছে।
ভুক্তভোগীদের অভিযোগের তীর সরাসরি আমিশাপাড়া ইউনিয়ন ভূমি অফিসের তহসিলদার উজ্জ্বল বড়ুয়ার দিকে। গত ফেব্রুয়ারির শেষের দিকে পার্শ্ববর্তী বেগমগঞ্জ উপজেলার সেতুভাঙ্গা তহসিল অফিস থেকে তিনি এখানে যোগদান করেন। এরপর থেকেই তিনি যেন দালাল সিন্ডিকেটের সঙ্গে হাত মিলিয়ে সেবাপ্রার্থীদের নিত্যদিনের হয়রানি শুরু করেছেন। একাধিক ভুক্তভোগী জোর দিয়ে বলেছেন, এই অফিসে ঘুষ ছাড়া কোনো কাজই হয় না। ফাইল নড়ে না এক ইঞ্চিও!
আমিশাপাড়া ইউনিয়ন ভূমি অফিসের সামনে স্থানীয় চা দোকানী হৃদয় (৪০) ক্ষোভের সঙ্গে জানান, উজ্জ্বল বড়ুয়া আসার পর থেকেই ঘুষ লেনদেন এতটাই বেড়েছে যে, প্রতিদিন ঘুষের টাকা ফেরত নিতে এসে মানুষ এখানে জটলা করে। জমির মালিকদের সঙ্গে তহসিলদারের ঘুষের টাকা নিয়ে রীতিমতো হইচই হয় প্রতিনিয়ত।
একই অফিসের সামনে আর এক দোকানদার আকবর হোসেন তার নিজের মর্মান্তিক অভিজ্ঞতা বর্ণনা করে বলেন, আমার জমি নামজারি করতে তহসিলদার উজ্জ্বল বড়ুয়াকে প্রথমে ৭ হাজার টাকা দিয়েছিলাম। কিন্তু তাতেও কাজ হয়নি, তিনি আরো টাকা দাবি করেন! উপায় না দেখে বাধ্য হয়ে আরও ৪ হাজার টাকা দিয়ে তবেই নামজারি খতিয়ান পেয়েছি।
আমিশাপাড়া ইউনিয়ন ভূমি অফিসের একজন ‘নিয়োজিত’ দালাল, বেজার গাঁও গ্রামের শাহাদাত হোসেন, ক্যামেরার সামনে অকপটে স্বীকার করেন তার দীর্ঘদিনের দালালি কার্যক্রম। তিনি জানান, খাজনা পরিশোধের জন্য অনলাইনে আবেদন করতে ৩০০ টাকা, তাকে দিতে হয় ২০০ টাকা, আর তহসিলদারকে দিতে হয় ৩০০ টাকা। এর পরে রসিদের মাধ্যমে খাজনা নেওয়া হয়, যা সাধারণ মানুষকে দ্বিগুণ আর্থিক চাপ দিচ্ছে।
দেওটি ইউনিয়ন ভূমি অফিসের চিত্র আরও ভয়াবহ। গত বৃহস্পতিবার মিজান নামের এক জমির মালিক নামজারি করতে এসে যে অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হয়েছেন, তা রীতিমতো অবিশ্বাস্য। দেওটি গ্রামের এই বাসিন্দা জানান, মাত্র ১২ শতাংশ জমি নামজারি করিয়ে দিতে অফিসের পিয়ন মোস্তফা সরাসরি ১২ হাজার টাকা ঘুষ দাবি করেন! এমন অযৌক্তিক দাবিতে দিশেহারা হয়ে নামজারি না করেই তিনি বাড়ি ফিরে যেতে বাধ্য হন।
পাশ্ববর্তী চাটখিল উপজেলার নোয়াখোলা ইউনিয়ন ভূমি অফিস থেকে গত এপ্রিল মাসে এই অফিসে যোগদান করেন তহসিলদার জয়নাল আবেদীন। তার বিরুদ্ধেও গুরুতর অভিযোগ রয়েছে। তিনি স্থানীয় নাহিদ নামের এক যুবককে ‘কম্পিউটার অপারেটর’ হিসাবে নিয়োগ দিয়েছেন বলে জানা গেছে, যাকে তিনি প্রতিদিন ১০০০ টাকা বেতন দেন। অভিযোগ উঠেছে, এই বেতনের টাকা বিভিন্ন অজুহাতে জমির মালিকদের কাছ থেকেই আদায় করা হয়, যা এক ধরণের নতুন কৌশলের দুর্নীতি।
দেওটি ইউনিয়ন পরিষদের সামনে চা দোকানী সুজন জানান, প্রতিদিন জমির মালিকরা এই অফিসে নামজারি ও খাজনা পরিশোধ করতে আসেন। আমার দোকানে বসে তারা চা খান এবং কাজের বিনিময়ে তহসিলদার কত টাকা ঘুষ নিয়েছেন, সেই আলোচনা করেন। অনেক জমির মালিককে ২-৩ বারও এই অফিসে আসতে হয়।
অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে আমিশাপাড়া ইউনিয়ন ভূমি অফিসের তহসিলদার উজ্জ্বল বড়ুয়া তার অফিসে কোনো অনিয়ম বা হয়রানির কথা সরাসরি অস্বীকার করেন। দেওটি ইউনিয়ন ভূমি অফিসের তহসিলদার জয়নাল আবেদীন তার অফিসে ব্যক্তিগতভাবে কম্পিউটার অপারেটর নিয়োগের বিষয়টি স্বীকার করলেও এর অর্থের উৎস নিয়ে প্রশ্ন রয়েই যায়।
তবে সোনাইমুড়ী সহকারী কমিশনার (ভূমি) দ্বীন আলম জান্নাত একটি প্রচলিত আশ্বাসের বাণী শুনিয়েছেন। তিনি বলেন, কেউ কোনো অভিযোগ করলে আমরা অবশ্যই তদন্ত করে ব্যবস্থা গ্রহণ করব।তার এই গতানুগতিক আশ্বাসের পর ভুক্তভোগী সাধারণ মানুষ এখন অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছেন, আদৌ কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয় কিনা এবং সোনাইমুড়ীর ভূমি অফিসগুলো এই সর্বগ্রাসী ঘুষের থাবা থেকে মুক্ত হয় কিনা। জনগণের প্রত্যাশা, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দ্রুত ও কঠোর হস্তক্ষেপের মাধ্যমে এই অনিয়মের লাগাম টেনে ধরা হবে এবং ভূমি সেবা সত্যিকারের জনগণের দোরগোড়ায় পৌঁছাবে।
আপনার মতামত লিখুন :