
সত্য, সুন্দর, পবিত্রতা মানুষের সর্বশ্রেষ্ঠ মানবিক চরিত্রের গুণ। এই গুণগুলো আমাদের প্রেরণা দেয় নতুন কিছু করার; বাঁচতে শেখায় ন্যায়ের পক্ষে সততার সাথে; জাগ্রত করে পারস্পরিক শ্রদ্ধা এবং পরিমিতি বোধ; তৈরি করে যতটুকু প্রাপ্য ঠিক ততটুকু নেওয়ার মানসিকতা; আনয়ন করে সকলের মাঝে ভারসাম্যতা। প্রারম্ভে সত্যের কঠোরতা, সুন্দরের আহŸান এবং পবিত্রতার সংস্পর্শে মানুষের মানবিক মূল্যবোধ জেগে উঠার প্রত্যয় ব্যক্ত করছি নমনীয়ভাবে। প্রসঙ্গ ক্রমানুসারে সুশৃঙ্খলভাবে উপস্থাপন এবং তথ্য উপাত্তের সংমিশ্রণ ঘটানোর প্রয়াসে..
সুজলা-সুফলা, শস্য-শ্যামলা, আমাদের এই দেশ, ‘বাংলাদেশ’। ‘বাংলাদেশ’ নদীমাতৃক দেশ, ষড়ঋতুর দেশ, উর্বর ভূমির দেশ। বাঙ্গালীর রয়েছে সমৃদ্ধশালী ইতিহাস, আছে বীরত্বের উপাধি।
যেকোন দেশের মূল চালিকা শক্তি হচ্ছে সেদেশের অর্থনীতি। সেদিক দিয়ে বাংলাদেশের অর্থনীতি কৃষির উপর নির্ভরশীল। বাংলাদেশে সর্বাধিক শ্রমশক্তি কৃষিকাজে নিয়োজিত। কৃষি বাংলাদেশের সফল পেশা। কৃষিজ পণ্য মানব জীবন ধারণের একমাত্র উপাদান।
বাংলাদেশে মৌলিক চাহিদার পাঁচটির মধ্যে সর্বাগ্রে রয়েছে, অন্ন বা খাদ্য। বাংলাদেশসহ সমগ্র বিশ্বের এই মুহূর্তে সবচেয়ে বেশি আলোচিত বিষয়, ‘খাদ্য নিরাপত্তা’। ‘খাদ্য নিরাপত্তা’ শব্দদ্বয়ের ক্ষেত্রে দু’টো বিষয় চলে আসে।
খাদ্য সংকট :
কয়েকটি উন্নয়নশীল রাষ্ট্রে মাথাপিছু আয় যথেষ্ট পরিমাণ বেড়ে যাওয়ায় বিশ্ব খাদ্য বাজারে খাদ্যের চাহিদা সম্প্রসারিত হচ্ছে যা খাদ্যের যোগান চাহিদার তুলনায় অপ্রতুল। এই পরিস্থিতির জন্য বিশ্ব জলবায়ু পরিবর্তন এবং প্রাকৃতিক বিপর্যয় অনেকাংশে দায়ী। পৃথিবীর অনেক দেশে খাদ্যদ্রব্য এখন ইথানল বা বায়ো ফুয়েল তৈরিতে চলে যাচ্ছে। ইথানল উৎপাদনের জন্য প্রচুর পরিমাণ অর্থ ভর্তুকি দেয়া হচ্ছে। ফলশ্রæতিতে অধিক সংখ্যক ভূমি ক্রমাগতভাবে খাদ্যদ্রব্য উৎপাদনের পরিবর্তে ইথানল তৈরিতে যাবে। এতে করে পৃথিবীতে খাদ্য সংকটের ভয়াবহতা চরমে পৌঁছাবে। বিশ্বব্যাপী খাদ্য সংকটের এই প্রভাব বলয়ের বাইরে নেই, বাংলাদেশ। এই খাদ্য সংকট সমাধানে প্রয়োজন বিশ্ব আলোচনা, পরিকল্পনা প্রণয়ন, সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং বাস্তবায়ন।
খাদ্যের রাসায়নিক পদার্থের সংমিশ্রণ :
বর্তমান প্রযুক্তি নির্ভর কৃষি ব্যবস্থার অন্যতম বৈশিষ্ট্যই হচ্ছে খাদ্যে রাসায়নিক পদার্থের উপস্থিতি। যা এই নিবন্ধ বিশ্লেষণের গুরুত্বপূর্ণ দিক।
মানুষের স্ব প্রচেষ্টায় খাদ্য ও অন্যান্য ফসল সমূহ উৎপাদন, হাঁস-মুরগি, গরু-মহিষ, ছাগল-ভেড়া, পশু-পাখি পালন, ফল ও অন্যান্য উপকারী বৃক্ষ রোপন ও যতœসহকারে পরিচর্যা করে বড় করা এবং মাছের চাষ প্রভৃতির এই সমগ্রকের একত্রিত রূপই হলো-কৃষি। বাংলাদেশে কৃষি কাজের ধারাবাহিকতায় সনাতনী পদ্ধতি অতীত প্রায়। সনাতনী পদ্ধতির স্থানে জায়গা করে নিয়েছে প্রযুক্তি। একটি উদাহরণ দিয়ে বিষয়টিকে স্পষ্ট করা যেতে পারে, তা হচ্ছে-কৃষি কাজে লাঙ্গল গরুর ব্যবহার সর্বপ্রথম প্রবর্তন করে, ‘অষ্টিকরা। উদ্দেশ্য ভূমি কর্ষণের মাধ্যমে মাটি ঝুরঝুর বা উর্বর করা। এই লাঙ্গল গরুর স্থানে এসেছে ‘ট্রাক্টর’। সনাতনী পদ্ধতিতে মাটির গুণাগুন বৃদ্ধির জন্য প্রয়োগ করা হতো কম্পোস্ট বা জৈব সার। বর্তমানে এর পরিবর্তে যুক্ত হয়েছে বিভিন্ন ধরনের রাসায়নিক সার।
বর্তমানে কৃষিকাজে ব্যবহৃত রাসায়নিক সারগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো-
ইউরিয়া; এমোনিয়াম সালফেট; ট্রিপল সুপার ফসফেট; সিঙ্গেল সুপার ফসফেট; ডাই এমোনিয়াম ফসফেট; মিউরেট অব পটাশ; পটাশিয়াম সালফেট; ম্যাগনেসিয়াম সালফেট; ম্যাঙ্গানিজ সালফেট; জিঙ্ক অক্সাইড; জিঙ্ক সালফেট; জিপসাম; এমোনিয়াম মলিবডেট; সলোবোর; বোরাক্স; বরিক এসিড প্রভৃতি সার প্রয়োগের ফলে ফসলের বাম্পার ফলন হচ্ছে তা যেমন দৃশ্যনীয় তেমনি এই সারগুলোর মাত্রা প্রয়োগ কতটুকু পরিবেশ বান্ধব তা নিয়ে আমাদের কোনো মাথাব্যথা নেই তাও লক্ষণীয়। ফলশ্রুতি হচ্ছে- জমির উর্বরতা হ্রাস, স্বাস্থ্য ঝুঁকির পরিধি ব্যাপ্ত।
আমাদের দেশে শাকসবজি উৎপাদনের বিভিন্ন পর্যায়ে ব্যবহার করা হয় নানা ধরনের কীটনাশক ও রাসায়নিক সার। কখনও কৃষি কর্মকর্তার পরামর্শ ছাড়া, কখনও কীটনাশক বিক্রেতার পরামর্শে এবং কখনওবা বেশি সতর্কতার কারণে একই ফসলে এক বা একাধিক কীটনাশক ব্যবহার করছে চাষীরা। এতে একদিকে যেমন উপকারী ও অপকারী উভয় ধরনের কীটপতঙ্গ মরে পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট হচ্ছে, তেমনি দূষিত হচ্ছে পরিবেশ, ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে মানুষসহ অন্যান্য প্রাণীসম্পদ। এসব কীটনাশক ব্যবহারে কীটপতঙ্গের প্রতিরোধ ক্ষমতা সৃষ্টির পাশাপাশি প্রজনন বৃদ্ধি পেতে পারে।
ফলমূলের ফলন বাড়াতে আমাদের দেশে ব্যবহার করা হয় হরমোন, পাকাতে কার্বাইড ও ইথিলিন এবং পচন রোধে ফরমালিন। সাম্প্রতিক সময়ে পোকা দমন করতে নারকেলেও অতিমাত্রায় কীটনাশক ব্যবহার করা হচ্ছে। তাছাড়া দ্রæত ফল আসার জন্য আনারসে অক্সিম জাতীয় হরমোন ব্যবহৃত হচ্ছে যা মানব স্বাস্থের জন্য খুবই মারাত্মক। খাদ্যে এরকম রাসায়নিক বিপ্লবের পেছনে সুনির্দিষ্ট কিছু কারণ প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষভাবে দায়ী, যেমন-
বিষমুক্ত ফসল উৎপাদন ও নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিতকল্পে করণীয় পদক্ষেপ সমূহঃ
ফসল সংরক্ষণে ফরমালিনের বিকল্প ‘কাইটোসেন’ :
খাদ্যে রাসায়নিক পদার্থ ব্যবহারের অন্যতম প্রধান কারণ হল ‘সংরক্ষণ’। খাদ্য সংরক্ষণে চিংড়ির খোসা থেকে নিরাপদ উপাদান ‘কাইটোসেন’ উদ্ভাবন করেছেন বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশনের বিজ্ঞানী ড. মোবারক আহম্মদ খান। তিনি তাঁর গবেষণায় দেখিয়েছেন কাইটোসেনের মাধ্যমে কীভাবে ফল ও সবজি সংরক্ষণ করা যায়। এই বিজ্ঞানী কাইটোসেন ব্যবহার করে আম (২-৩) সপ্তাহ, লিচু (১২-১৩) দিন, আনারস (১০-১২) দিন, করলা হিমায়িতভাবে (১৮) দিন এবং টমেটো (২১) দিন পর্যন্ত সংরক্ষণ করতে সক্ষম হয়েছেন। খাদ্যের গুণগত মান, আকৃতি, রঙ ও স্বাদে কোনরূপ পরিবর্তন হবে না কাইটোসেন ব্যবহারে। ফেলে দেওয়া চিংড়ির খোসা থেকে প্রাকৃতিকভাবেই তৈরি হয় এই কাইটোসেন। এতে খরচ কম এবং এটা মানব দেহের জন্য ক্ষতিকর নয়। প্রতি কেজি আমে ১ টাকার কাইটোসেনই যথেষ্ট। প্রতি কেজি সবজি সংরক্ষণে খরচ পড়বে ৪০ পয়সা। কস্টিক সোডা দিয়ে চিংড়ির খোসা পরিষ্কারের পর তৈরি হয় ‘কাইটিন’। গামা রশ্মির রেডিয়েশনের মাধ্যমে এই ‘কাইটিন’ থেকে প্রস্তুত হয় ‘কাইটোসেন’। এখানে উল্লেখ্য যে, খাদ্য সংরক্ষণে ‘রেডিয়েশন প্রযুক্তি’ বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডঐঙ) এবং যুক্তরাষ্ট্রের ফুড অ্যান্ড ড্রাগ অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (টঝঋউঅ) অনুমোদিত একটি নিরাপদ প্রক্রিয়া।
জেড সি সি পদ্ধতি :
ভারতের উৎপাদিত ফল ও শাকসবজির প্রায় এক তৃতীয়াংশ নষ্ট হয়ে যেত সংরক্ষণের অভাবে। এই সমস্যা সমাধানে বেশ কিছু পদ্ধতি নিয়েছিল তারা। এমনই একটি সফল পদ্ধতি হচ্ছে ‘ইভাপোরেটিভ কুলার’। এই পদ্ধতি ব্যবহার করে, ক্ষতিকর রাসায়নিক ব্যবহার ছাড়াই বেশ কিছু দিন শাকসবজি ও ফলমূল সংরক্ষণ করা যেতো। ১৯৯৫ সালে এই পদ্ধতি খানিকটা সংস্কার করেন নাইজেরীয় শিক্ষক মোহাম্মদ বাহ আব্বা। তাঁর পদ্ধতি অনুসরণ করেই তৈরি হয় জিরো এনার্জি কুল চেম্বার বা (তঈঈ) পদ্ধতি। এটি আসলে দ্বি-স্তর বিশিষ্ট ইটের দেয়ালের তৈরি চার কোণা স্থাপনা। দুই স্তরের মধ্যবর্তী ফাঁকা স্থানে বালু ও পানি দিয়ে তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রিত হয়ে থাকে। বর্তমান ভারতে এটি বহুল ব্যবহৃত। বাংলাদেশের কৃষকরা পচনশীল কৃষিজাত ফসল সংরক্ষণে (তঈঈ) পদ্ধতি সহজেই প্রয়োগ করতে পারে। ১০০ কেজি ধারণ ক্ষমতার একটি (তঈঈ) বানাতে খরচ পড়বে ৭ হাজার টাকা
খাদ্য নিরাপত্তা আইন কানুন এবং খাদ্য দ্রব্যে ভেজাল নির্ণয়ের যন্ত্রপাতি :
মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর, থাইল্যান্ড ও ইন্দোনেশিয়ার খাদ্য নিরাপত্তা আইনের তুলনায় বাংলাদেশের খাদ্য নিরাপত্তা আইন কোন অংশে খাটো নয়, বরং শক্তিশালী। এই সকল রাষ্ট্রে খাদ্যে ভেজাল ও ক্ষতিকর রাসায়নিক পদার্থ মেশানোর প্রক্রিয়াও প্রায় একই রকম। তবে আইনগত বৈসাদৃশ্য আছে। ইন্দোনেশিয়ার খাদ্য আইনে জেনিটিক্যাল মডিফাড়েড (এগ) এর উল্লেখ আছে। থাইল্যান্ডে কোন খাদ্য দ্রব্যের বিজ্ঞাপণ প্রচারের আগে খাদ্যের গুণগত মানের সাথে বিজ্ঞাপণের সামঞ্জস্য আছে কি না তা খতিয়ে দেখে তারপর অনুমোদন দেয়। মালয়েশিয়ায় খাদ্য আইন তেমন কঠোর না হলেও প্রচলিত আইনের কঠোর প্রয়োগে খাদ্য নিরাপত্তার বিষয়টি নিশ্চিত হয়েছে। বাংলাদেশে খাদ্য নিরাপত্তা সংক্রান্ত কম পক্ষে ১৫টি আইন দ্বারা আইনি কাঠামো পরিচালিত হচ্ছে। যা খাদ্য নিরাপত্তার মতো একটি একক উদ্দেশ্যের জন্য এত আইন, পরিস্থিতিকে আরো জটিল থেকে জটিলতর করেছে। এই জটিলতার জন্য প্রয়োজন সুস্পষ্ট ও সুনির্দিষ্ট খাদ্য নিরাপত্তা আইন, যা খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করণে অপরিসীম ভূমিকা রাখবে। বাংলাাদেশে খাদ্য নিরাপত্তার আরেকটি বড় সমস্যা হলো ভেজাল ও ক্ষতিকর রাসায়নিক পদার্থ নির্ণয়ের পর্যাপ্ত যন্ত্রপাতি ও সুদক্ষ জনবলের অভাব। কিছুদিন আগেও ফরমালিন পরীক্ষা যন্ত্রের কার্যকারিতা, প্রশ্নের সম্মুখিন হয়। খাদ্যে ভেজাল নির্ণয়ে দরকার আধুনিক গবেষণাগার যা সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞ দ্বারা পরিচালিত হবে।
উপরে উল্লেখিত বিশ্লেষণের সাথে আরো যে সকল বিষয়ে শক্তভাবে অবস্থান নিতে হবে সেগুলো নিম্নরূপ-
বাংলাদেশে প্রচুর জনসংখ্যার কারণে চাষের জমি কমে গেছে প্রায় এক তৃতীয়াংশ, অথচ খাদ্য উৎপাদন বেড়েছে কয়েকগুণ। প্রমাণিত সত্য এই, ‘বাঙ্গালীরা সব পারে’। সুতরাং খাদ্যে রাসায়নিক বিপ্লবের স্থানে প্রাকৃতিক ‘সবুজ বিপ্লব’ আমাদের জন্য অসম্ভব কিছু না।
পরিশেষে সাবলীলভাবে স্বীকার করতে হচ্ছে, প্রকৃতির কাছে আমরা অপরাধী। ‘লোভ’আমাদের মূল্যবোধ গুপ্ত করেছে এবং প্রকৃতি প্রেমী হওয়া থেকে বঞ্চিত করেছে। প্রকৃতির প্রকৃত সতেজতা ফিরিয়ে আনব এমন প্রতিশ্রæতি আমার। আমি থেকে আমরাই পারব এই সমস্যা সমাধান করতে। তবেই উৎপাদিত হবে বিষমুক্ত ফসল ও নিশ্চিত হবে খাদ্য নিরাপত্তা তথা নিরাপদ খাদ্য।
আপনার মতামত লিখুন :