প্রকাশিত: 30 August, 2025
সর্বশেষ আপডেট : 30 August, 2025

২০২৪ সালের ভয়াবহ বন্যার ধকল সামলে ঘুরে দাঁড়াচ্ছে জেলার প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষ

নিজস্ব প্রতিবেদক  : ২০২৪ সালের ভয়াবহ বন্যার ধকল সামলে নিয়ে ঘুরে দাঁড়াচ্ছে সদর উপজেলার প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষ। সরেজমিনে উপজেলার কালাদরপ, এওজবালিয়া এবং আন্ডারচর ইউনিয়ন ঘুরে দেখা যায়, বন্যায় ক্ষতিগ্রন্ত পরিবারগুলোর কেউ সেলাই কাজ করছেন, কেউ দোকান করছেন, কেউ হোগলা পাতা দিয়ে রশি তৈরি করে করছেন, কেউ সবজি চাষ করছেন। এসব করে তারা পরিবারের খাবার এবং ছেলে মেয়েদের লেখাপড়ার খরচ জোগানোর পাশাপাশি কিছু টাকা সঞ্চয় করছেন।

জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন অফিসের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের বন্যায় নোয়াখালীর ৮ উপজেলা, ৭ পৌরসভা ও ৮৭ ইউনিয়নের পানিবন্দি মানুষের সংখ্যা ১১ লাখ, ৫৫ হাজার ৩০০। ২৫৪টি আশ্রয়কেন্দ্রে অবস্থান করে ২৫ হাজার ৬২৮ জন। মৃত্যু হয়েছে ১১ জনের।

অক্সফাম বাংলাদেশ’র তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের বন্যায় জেলার ৯০ শতাংশের বেশি মানুষ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ধ্বংস হয়েছে ৪৮ শতাংশ বাড়িঘর। এ ছাড়া পয়োনিষ্কাশনের ব্যবস্থা ও সুপেয় পানির সুবিধা শতভাগ অচল হয়েছে।

স্থানীয় বাসিন্দারো জানান, সদর উপজেলা  কালাদরপ, এওজবালিয়া এবং আন্ডারচর ইউনিয়নের বেশিরভাগ বাড়িঘর, দোকানপাট পানির নিচে তলিয়ে যায়। সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। পুকুরের পানির সাথে চারপাশের নোংরা পানি মিলে একাকার হয়ে যায়। বন্যার পানিতে টিউবওেয়েলগুলো ডুবে যায়। এ সময় চারদিকে খাবার ও বিশুদ্ধ পানির তীব্র সংকট দেখা দেয়। নিরুপায় হয়ে লোকজন বিভিন্ন আশ্রয়কেন্দ্রে ঠাঁই নেন। কেউ ১৫দিন কেউবা একমাস পর বাড়ি ফিরে সাজানো সংসারের সবকিছু লন্ডভন্ড হয়ে গেছে দেখে দিশেহারা হয়ে পড়েন। আশ্রয়কেন্দ্রে সরকারি বেসরকারিভাবে খাবার দেওয়া হলেও বাড়িতে খাবার ছিলনা কারোই। হাতে ছিলনা টাকা পয়সা। জমির ফসল, দোকানের মালামাল, ব্যবসার পুঁজি সবাই শেষ হয়ে যায় ভয়াল বন্যা।

এ সময় বন্যা দুর্গত মানুষের ভোগান্তি হ্রাস, মর্যাদা পুনঃস্থাপন এবং জীবন রক্ষায় অস্ট্রেলিয়ান হিউম্যানিটেরিয়ান পার্টনারশিপের (এএইচপি) অর্থায়নে এবং অক্সফামের সহযোগিতায় কমিউনিটি ডেভেলপমেন্ট সেন্টার- কোডেক ‘বাংলাদেশ ফ্লাড রেসপন্স’ নামে একটি প্রকল্প হাতে নেয়। ২০২৪ সালের অক্টোবর থেকে এ বছরের আগষ্ট মাস পর্যন্ত গত ১১ মাসে প্রকল্পভুক্ত তিন ইউনিয়নে বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ ২ হাজার ৬১৫টি পরিবারকে অন্তর্ভুক্তিমূলক ও বহুখাতভিত্তিক মানবিক সহায়তা প্রদান করা হয়।

এর মধ্যে ৭৫০টি পরিবারকে খাদ্য ও জীবিকায়নের জন্য নগদ ছয় হাজার করে টাকা, ৭৫০টি পরিবারকে তাদের পূর্বের ক্ষুদ্র ব্যবসা পুনরায় শুরু ও জীবিকা পুনঃস্থাপনের জন্য ১০ হাজার টাকা এবং ক্যাশ ফর ওয়ার্ক কর্মসূচির আওতায় ৭৫০ জনকে ২৮শ টাকা করে দিয়ে বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত ৪৩টি কাঁচা সড়ক মেরামত কাজ করানো হয়।

এছাড়া বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত ২ হাজার ৬১৫টি পরিবারকে খাদ্য সহায়তা, স্বাস্থ্য সুরক্ষা সামগ্রী, সবজি বীজ ও কম্বল বিতরণ করা হয়।

তিন ইউনিয়নে ৫০টি নতুন ল্যাট্রিন নির্মাণ ও ১০০টি ল্যাট্রিন মেরামত, ১৫টি নতুন টিউবওয়েল স্থাপন ও ১৫২টি টিউবওয়েল মেরামত এবং ৫০টি নারীবান্ধব গোসলখানা স্থাপন করা হয়।
শিক্ষকদের সহযোগিতায় ৯টি স্কুলে হ্যান্ড ওয়াশের কৌশল ও মেয়েদের ব্যক্তিগত পরিচ্ছন্নতা বিষয়ে ধারণা দেওয়া হয়।

তিন ইউনিয়নে ২০ জন করে ৬০ জন স্বেচ্ছাসেবককে শিশু সুরক্ষা ও নারী অধিকার বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। তারা বন্যাকবলিত এলাকায় এসব বিষয়ে জনসচেতনতা সৃষ্টির লক্ষ্যে কাজ করেন। এছাড়া বাল্য বিয়ে প্রতিরোধে কমিউনিটি ভিত্তিক তিনটি ব্রিগেড এলাকায় বাল্য বিয়ে প্রতিরোধে কাজ করেন, প্রয়োজনে প্রশাসনের সহায়তা নেন।

কালাদরাপ ইউনিয়নের ফাহানা ইয়ামিন (৩৫) বলেন, ‘বন্যায় সময় ছেলে মেয়ে দুইটাকে নিয়ে অকে কষ্ট করেছি। ঘরে ভেতরেও পানি উঠে গেছে। চুলার ভেতরেও পানি উঠে যাওয়ায় কয়ৈকদন রান্না করতে পানিনি। ঘরের ভেতরে অনেক কষ্টে করেছি। টয়লেটেও যেতে পারিনি। পরে ছাত্ররা ঘরে কিছু শুকনো খবার দিয়ে যায়। বন্যার পানিতে আমাদের দোকানের সব মালামাল ভেসে গেছে। একটা ফ্রিজ ছিল, নষ্ট হয়ে গেছে। কয়েকদিন পরে আমার স্বামী কাজের খোঁজে চট্টগ্রাম চলে যান। হাতে কোন টাকা পয়সা না থাকায় দোকানটা খুলতে পারছিলাম না। কিভাবে খাবো, কিভাবে কি করবো চিন্তা করে কুল কিনারা পাচ্ছিলাম না। এ সময় এক বাড়িতে কোডেকের লোকজন বন্যায় ক্ষতিগ্রস্তদের নিয়ে মিটিং করছে শুনে আমি সেখানে যাই। ওরা আমার নামটা নেয়। পরে দুইদিনজন ভাই আমার বাড়িতে এবং দোকানে এসে সব দেখে নতুন করে দোকান চালু করার জন্য আমাকে ১০ হাজার টাকা দেন। ওই টাকা দিয়ে চিনি, চা পাতা, দুধ, বিস্কুট এসব কিনে আমি দোকানটা আবার চালু করি। এখন দোকানটা ভালো চলতেছে। প্রতিদিন দুই তিনশ টাকা আয় হয়। এখন ছেলে মেয়েদের খাবার এবং পড়ালেখা চলতেছে।’

একই ইউনিয়নের শারীরিক প্রতিবন্ধী আলী হোসেন (৩৭) বলেন, আমি বন্যাতে ১৭ দিন ছিলাম আশ্রয়কেন্দ্রে। আশ্রয়কেন্দ্রে থেকে ফিরে দেখি আমার থাকার ঘর এবং দোকান নষ্ট হয়ে গেছে। দোকানের মালামাল কিছু নেই। তখন কয়েক দিন আমি মানুষের কাছ খুঁজে খুঁজে খেয়েছি। এরপর একটি স্কুলে কোডেকের লোকজন বন্যার বিষয়ে মিটিং করছে শুনে আমি তাদের সাথে দেখা করে সব খুলে বলি। পরে তারা আমার দোকানে এসে সব দেখে আমাকে ১০ হাজার টাকা দেন। ওই টাকার মধ্যে আমি দুই হাজার টাকা দিয়ে চায়ের কাপ, প্লাক্স কিনি এবং বাকি আট হাজার টাকা দিয়ে অন্যান্য মামালা কিনে দোকানটা চালু করি। এখন আমি দোকানে দৈনিক ছয়/সাতশ টাকা বিক্রি করি। এরমধ্যে এক দেড়শ টাকা খরচ করি এবং প্রতিদিন ১০ টাকা ২০ টাকা করে জমা রাখতেছি।

ফাতেমা বেগম নামে চল্লির্শোধ এক নারী বলেন, ‘বন্যার পানিতে আমাদের পুকুর ডুবে গেছে। পুকুরে গোসল করলে আমাদের গায়ে নানা রকম রোগ হয়, জ্বর উঠে। এখন আমাদের জন্য গোসলখানাটা করে দেওয়াতে আমরা কল (টিউবওয়েল) থেকে পানি নিয়ে গোসল করি। সুন্দরভাবে সুস্থ আছি।’

মুন্নি বেগম (৩০) নামে অেন্য এক নারী বলেন, ‘আমাদের কলাদরাপ ইউনিয়নে অনেক ভয়াবহ বন্যা হয়েছে। আমাদের অনেক কিছু নষ্ট হয়েছে। ঘরে পানি উঠেছে। আমরা তিনমাস শুকনো খাবার খেয়েছি। আমাদের টয়লেট ভেঙ্গে গেছে। টয়য়লেটের পানি, পুকুরের পানি মিশে অনেক রোগব্যাধী ছড়িয়েছে। অলার্জি, চুলকানি এসব দেখা দেয়। এখনও আমরা পুকুরে নামতে পানি না। এখন অক্সফার্ম আমাদের পাঁচটি ফ্যামেলির জন্য একটা টয়লেট দিয়েছে। আল্লাহর রহমতে আমরা এখন ভালো আছি।
পশ্চিম দেবীপুর গ্রামের মোঃ হারুন (৬৫) বলেন, ২০২৪ সালের বন্যায় আমাদের এলাকার শতকরা ৯০ জন মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বাড়িঘরে পানি উঠে। এর পরে আশ্রয়কেন্দ্রে গিয়ে কিছুদিন ছিল। আশ্রয়কেন্দ্রে পাড়া প্রতিবেশী এবং বিভিন্ন সংস্থা থেকে কিছু সহযোগীতা দিয়েছে, এগুলা দিয়ে চলছে। আশ্রয়কেন্দ্রে থেকে এসে বাড়িঘরে ঠিকমতো খাবার নেই, অভাব অনটনের মদ্যে দিনযাপন করেছি। এলাকার অধিকাংশ মানুষ নিরীহ, একা দুর্ভোগ কাটিয়ে উঠার মতো লোক নেই। কোডেক যাদেরকে সহযোগীতা করছে তারা ঘুরে দাঁড়িয়েছে। কিন্তু এখনো অনেক লোক অসুবিধার মধ্যে আছে, অনেক অভাব অনটন আছে। এখন উনাদের পাশিাপাশি সরকারি বেসরকারিভাবে আরো সহযোগীতা দরকার।

‘বাংলাদেশ ফ্লাড রেসপন্স’ প্রকল্পের মনিটরিং অফিসার শর্মী আক্তার বলেন, ২০২৪ সালে যে ভয়াবহ বন্যাটা ওখানে আঘাত হেনেছিল। তাদের জীবনে চরম বিপর্যয় নেমে এসেছিল। তাদের মধ্য থেকে আমরা যাচাই-বাছাই করে সব চাইতে খারাপ অবস্থা যাদের তাদেরকে উপকারভোগী হিসেবে নির্বাচন করেছি।তারা আজ স্বাবলম্বী এবং নিজেরাই আবার সঞ্চয় করছেন। প্রতিবন্ধী, স্বামী পরিত্যক্ত নারী, বিধবাসহ বিভিন্ন অসহায় পরিবারগুলো আমাদের মাধ্যমে ক্ষত কাটিয়ে ঘুরে দাঁড়িয়েছে। বিশেষ করে নারীদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত হওয়ায় এটি পরিবারগুলোর আর্থিক স্থিতিশীলতা বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। কিন্তু ওই সময় আমরাতো সবাইকে সহযোগীতা দিতে পারিনি। ২৬শ ১৫ পরিবারকে আমরা এই ১১ মাসের প্রকল্পে ধাপে ধাপে বিভিন্ন কম্পোনেন্টে নিয়ে আসি। তাদের পূর্বের যে ব্যবসা ছিল তা আবারও নতুন করে জাগণের চেষ্টা করেছি। কিন্তু ওখানে আরো এমন আনেক পরিবার আছে, যারা বন্যার পর স্থান ত্যাগ করছে এবং পরে আবার ফিরে এসেছে ধীরে ধীরে। তাদের কারো কারো অবস্থা অনেক খারাপ হলেও আমরা তাদেরকে নিতে পানিনি। তো আমাদের একার পক্ষে এটা করা কখনোই সম্ভব না। এক্ষেত্রে সরকারি বেসরকারিভাবে সবাইকে এগিয়ে আসা প্রয়োজন। যেন তারা সকলকে ঘুরে দাঁড়াতে পারেন।

সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) হোমায়রা ইসলাম বলেন, ‘২০২৪ সালের বন্যা নোয়াখালীতে স্মরণকালের সবচেয়ে ভয়াবহ বন্যা এবং দীর্ঘদিন এ অঞ্চলে বন্যা হওয়ার কারণে মানুষের পূর্ব প্রস্তুতিটা কিছুটা কম ছিল। আকষ্মিক এ বন্যায় এমন ক্ষয়ক্ষতি হবে, তা কারো কল্পনাতেও ছিল না। বন্যা ও দীর্ঘস্থায়ী জলাবদ্ধতায় বহু পরিবার চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তবে সরকারি বেসরকারি পর্যায়ে নানা ধরণের কার্যক্রমের ফলে ক্ষতিগ্রস্তদের অনেকেই ঘুরে দাঁড়াতে শুরু করেছেন। তিনি বলেন, এ বন্যা থেকে পরবর্তীতে বন্যা হলে কি কি জায়গায় আমাদের প্রস্তুতি নিতে হবে সে সম্পর্কে একটা স্বচ্ছ ধারণা হয়েছে সবার।’

আরও পড়ুন