প্রকাশিত: 23 January, 2025
সর্বশেষ আপডেট : 23 January, 2025

নোয়াখালীতে গরিবের কম্বল ক্রয়ে দুর্নীতির থাবা

মোহাম্মদ হানিফ, সোনাইমুড়ী : সারাদেশে শীতার্ত ও দুস্থদের মাঝে প্রধান উপদেষ্টার ত্রাণ তহবিল ও ত্রাণ মন্ত্রণালয় থেকে ৭ লাখ ৭৯ হাজার পিস কম্বল কিনতে ৩৩ কোটি ৮৭ লাখ ৫০ হাজার টাকা বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। এর মধ্যে নোয়াখালী জেলায় মোট ৬৫ লাখ ৫০ হাজার টাকা বরাদ্দ এসেছে। এছাড়া প্রধান উপদেষ্টার ত্রাণ তহবিল থেকে নোয়াখালীতে ১০ হাজার পিস কম্বল বরাদ্দ এসেছে।
তবে সরকারি বরাদ্দের টাকায় কম্বল ক্রয় এবং দুস্থদের মাঝে বিতরণের ক্ষেত্রে বড় ধরনের দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে।

জানা যায়, গত ১২ ডিসেম্বর ২০২৪ তারিখে দেশের চার বিভাগের ৩৯ জেলার ২৮৯ উপজেলা এবং চার মহানগরীতে শীতার্ত মানুষের মাঝে কম্বল বিতরণের জন্য দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয় থেকে ৮ কোটি ৭৮ লাখ টাকা বরাদ্দ দেয়া হয়। এর মধ্যে নোয়াখালী জেলার নয় উপজেলায় ৩ লাখ করে মোট ২৭ লাখ টাকা বরাদ্দ দেয়া হয়। পরবর্তীতে একই মাসের ১৯ তারিখ দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে কম্বল বিতরণের জন্য আট বিভাগের ৬৪ জেলা ও ৪৯৫ উপজেলায় ‘ক’, ‘খ’ ও ‘গ’ ক্যাটাগরিতে মোট ১৩ কোটি ৮ লাখ টাকা সংশ্লিষ্ট জেলা প্রশাসক ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার অনুকূলে বরাদ্দ দেয়া হয়।

ওই বরাদ্দে নোয়াখালীর সদর, বেগমগঞ্জ, হাতিয়া ও সোনাইমুড়ী উপজেলায় তিন লাখ এবং সেনবাগ, কোম্পানীগঞ্জ, সুবর্ণচর ও কবিরহাট উপজেলায় আড়াই লাখ করে মোট ২৪ লাখ ৫০ হাজার টাকা বরাদ্দ দেয়া হয়। একই দিন অর্থাৎ ১৯ ডিসেম্বর দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে কম্বল বিতরণের জন্য দেশের ৬৪ জেলার ৩৩০ পৌরসভায় ‘ক’, ‘খ’ ও ‘গ’ ক্যাটাগরি অনুযায়ী যথাক্রমে ২ লাখ, দেড় লাখ ও এক লাখ টাকা হারে মোট পাঁচ কোটি ৬৮ লাখ টাকা সংশ্লিষ্ট পৌর প্রশাসক/উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার অনুকুলে বরাদ্দ দেয়া হয়।

বরাদ্দের অংশ হিসেবে নোয়াখালী সদর, চৌমুহনী, চাটখিল, বসুরহাট ও সোনাইমুড়ী পৌরসভায় দুই লাখ করে ১০ লাখ টাকা। কবিরহাট ও সেনবাগ পৌরসভায় দেড় লাখ এবং হাতিয়া পৌরসভায় এক লাখ মোট চার লাখ টাকা বরাদ্দ দেয়া হয়। সর্বসাকুল্যে নোয়াখালীর আট পৌরসভার মোট বরাদ্দের পরিমাণ দাঁড়ায় ১৪ লাখ টাকা। এছাড়া একই মাসের ৩১ ডিসেম্বর প্রধান উপদেষ্টার ত্রাণ তহবিল থেকে জেলার দুস্থ মানুষের মাঝে বিতরণের জন্য জেলা প্রশাসকের অনুকূলে ১০ হাজার পিস কম্বল বরাদ্দ প্রদান করা হয়।

অভিযোগ উঠেছে, বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাদের যোগসাজশে নিম্নমানের কম্বল ক্রয় করা হয়েছে। ক্রয় কমিটিতেও অনিয়ম করা হয়েছে। এ ছাড়া বিতরণের ক্ষেত্রেও অসহায় মানুষের পরিবর্তে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সচ্ছল নেতা ও তাদের কর্মীদের মাঝে কম্বলগুলো বিতরণ করা হয়েছে। এমনকি সরকারি বরাদ্দের টাকায় ক্রয়কৃত কম্বল রাজনৈতিক নেতারা তাদের দলীয় ব্যানারে জনসাধারণের মাঝে বিতরণ করেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। উপজেলা প্রশাসন তদারকির মাধ্যমে নিম্ন আয়ের অসহায় মানুষদের বাদ দিয়ে বিভিন্ন ইউনিয়নের চেয়ারম্যান ও রাজনৈতিক নেতাদের মাধ্যমে কম্বল বিলি করেছেন।

সোনাইমুড়ী উপজেলা রেলস্টেশনের ছিন্নমূল হতদরিদ্র জাহাঙ্গীর আলমের (৬০) সঙ্গে বুধবার রাতে কথা হলে তিনি জানান, দীর্ঘদিন থেকে এই প্লাটফর্মেই থাকেন তিনি। চলতি শীত মৌসুমে সরকারিভাবে কোনো কম্বল বা শীতবস্ত্র পাননি। শীতে অতিকষ্টে রাত যাপন করছেন।

সোনাইমুড়ী উপজেলার বদরপুর আশ্রয় কেন্দ্রের বাসিন্দা আলেয়া বেগম জানান, হতদরিদ্র হিসেবে তিনি আশ্রয়ণ প্রকল্পে ঘর পেয়েছেন। তবে সরকারিভাবে হতদরিদ্রদের জন্য বরাদ্দের কম্বল তিনি পাননি। ঘরে চৌকি না থাকায় শীতের মধ্যে অতিকষ্টে বাচ্চাদের নিয়ে মেঝেতেই ঘুমাচ্ছেন তিনি।

অনুসন্ধানে জানা যায়, কম্বল বিতরণের ক্ষেত্রে সরকারিভাবে ছয়টি শর্ত পালনের নির্দেশ দেয়া হয়েছিল সংশ্লিষ্ট জেলা প্রশাসক ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাদের। সেসব শর্তের মধ্যে মানসম্মত কম্ব ক্রয়, বরাদ্দের অর্থ কম্বল ক্রয় ছাড়া অন্য কোনো খাতে ব্যবহার না করা, ক্রয় করা কম্বল অসহায়-দুস্থদের মাঝে বিতরণের বিষয়টি নিবিড়ভাবে তদারকি করা।

“দুস্থদের মাঝে বিনামূল্যে বিতরণের জন্য দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়, গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার” লেখা সিলকৃত কম্বল ব্যবহার করা। কম্বল ক্রয়ের ব্যয় বিবরণী দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তর এবং দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ে পাঠানো, সেই সঙ্গে কম্বল ক্রয়ের ক্ষেত্রে পিপিএ ২০০৬ এবং পিপিআর ২০০৮-এর বিধি ৬৯ মোতাবেক সংশ্লিষ্ট সব বিধিবিধান ও আর্থিক নিয়ম-আচার যথাযথভাবে প্রতিপালন করা। তবে এসব শর্ত যথাযথভাবে পালন করেননি সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।

কম্বল ক্রয়ের ক্ষেত্রে কাগজে-কলমে ক্রয় কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটির সদস্যরা এ বিষয়ে কিছুই জানেন না। কম্বল কিনতে বিজ্ঞপ্তি প্রদান করে দরপত্র আহবান করা হয়নি। এমনকি উপজেলা পরিষদের নোটিশ বোর্ডে কোটেশন বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়নি। কর্মকর্তারা নিজেদের খেয়ালখুশি মতো নিম্নমানের কম্বল বাজার থেকে ক্রয় করেছেন। এসব কম্বল রাজনৈতিক নেতাদের মাধ্যমে বিলি-বণ্টন করা হয়েছে। সরেজমিনে সোনাইমুড়ী-চাটখিল-সেনবাগ ও বেগমগঞ্জ উপজেলায় গিয়ে এসব অভিযোগের সত্যতা মিলেছে।

তবে বেগমগঞ্জ-চাটখিলের প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তারা কম্বলের বরাদ্দের বিষয়ে কোনো রকমের তথ্য প্রতিবেদককে সরবরাহ করেননি। তথ্য জানতে চাইলে তারা নানা তালবাহানা করেন।

সেনবাগ উপজেলা পরিষদের কয়েকটি সূত্রে জানা যায়, ১ম পর্যায়ে কম্বল ক্রয়ে উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. রেজাউল করিমকে আহবায়ক, যুব উন্নয়ন কর্মকর্তা খুরশিদ আহাম্মেদকে সদস্য ও পিআইও এনামুল হককে সদস্য সচিব করা হয়। তবে ক্রয় কমিটির আহবায়ক ও সদস্যরা জানেন না করে কম্বল ক্রয় করা হয়েছে।

দুস্থদের জন্য কম্বল ক্রয় কমিটির সদস্য সেনবাগ উপজেলা যুব উন্নয়ন কর্মকর্তা খুরশিদ আহাম্মেদ বলেন, ক্রয় কমিটির সভায় ছিলেন। কত টাকা দিয়ে কম্বল কেনা হয়েছে তা তিনি জানেন না। উপজেলা পিআইও কম্বল কিনেছেন তথ্যের জন্য তার সঙ্গে যোগাযোগ করতে বলেন।

সেনবাগ উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা (পিআইও) এনামুল হক বলেন, দুই হাজার ৮২৮ পিস কম্বল বিতরণ করা হয়েছে। কোটেশন বিজ্ঞপ্তির নোটিশের মাধ্যমে প্রতিটি কম্বল কিনতে ৩৪৮ টাকা ৭৫ পয়সা খরচ হয়েছে। তবে কোন প্রতিষ্ঠান থেকে কম্বল কেনা হয়েছে এবং কোটেশন বিজ্ঞপ্তিতে কয়টি প্রতিষ্ঠান অংশগ্রহণ করেছে- এমন প্রশ্নের কোনো উত্তর তিনি দেননি। এমনকি প্রকাশিত কোটেশন বিজ্ঞপ্তি কিংবা ক্রয়কৃত কম্বল তিনি প্রতিবেদককে দেখাতে পারেননি।

বেগমগঞ্জ পিআইও অফিসে সরেজমিনে গিয়ে জানা যায়, প্রথম ও দ্বিতীয় ধাপে ৬ লাখ টাকা কম্বল ক্রয়ে বরাদ্দ আসে। প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয় থেকে ১৫শ’ পিস কম্বল দেয়া হয়। তবে অফিস সহকারী মামুন কম্বল ক্রয়ের কমিটির কোনো তথ্য দিতে অনীহা প্রকাশ করে বলেন, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আরিফুর রহমান ক্রয় কমিটিতে না থাকলেও তিনিই কম্বল ক্রয় করেছেন। এ সংক্রান্ত সব তথ্য তার দপ্তরে পাওয়া যাবে।

পরবর্তীতে একাধিকবার বেগমগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. আরিফুর রহমানের মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি কল রিসিভ করেননি।

চাটখিল উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা শুব্রত দাস বলেন, এই উপজেলায় দুস্থদের জন্য কত টাকা বরাদ্দ এসেছে তা দেখে জানাতে হবে।

চাটখিল উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মিজানুর রহমান বলেন, উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তাকে আহবায়ক করে ক্রয় কমিটি গঠন করে দিয়েছেন। কম্বল ক্রয়ের তথ্য তাদের কাছে রয়েছে।

পরে চাটখিল উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা মো. আলি হোসাইনের সঙ্গে কথা হয় প্রতিবেদকের। তিনি কম্বল ক্রয় কমিটিতে আহবায়কের দায়িত্বে থাকার বিষয়টিই নিশ্চিত নন।

নোয়াখালী জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা মোহাম্মদ মাসুদুর রহমান জানান, কম্বল বরাদ্দ এসেছে সরাসরি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাদের কাছে। তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করলে সব তথ্য পাওয়া যাবে। অনিয়মের বিষয়ে তিনি কোনো মন্তব্য করেননি।

নোয়াখালী জেলা প্রশাসক খন্দকার ইসতিয়াক আহম্মেদ বলেন, দুস্থদের জন্য বরাদ্দের টাকায় কম্বল ক্রয়ে বা বিতরণে কোনো অনিয়ম হলে তদন্তপূর্বক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

আরও পড়ুন

  • বিশেষ প্রতিবেদন এর আরও খবর