
উপজেলা প্রতিনিধি, সদর : বাবা মা আর তিন ভাইয়ের সংসারে সবার বড় আনোয়ার হোসেন (৩৪) । ভাগ্য পরিবর্তন ও পরিবারের হাল ধরতে ২২ বছর বয়সে ওমানে পাড়ি জমান তিনি। কাজের ফাঁকে ইউটিউবে কুল চাষ দেখে আগ্রহ হয় তার। ৩ একর জায়গায় চাচা কবির মিয়াকে (৪৫) নিয়ে শুরু করেন কুল চাষ। অবশেষে বাজিমাৎ, কুলের বাম্পার ফলনে হাসি ফুটেছে আনোয়ারের মুখে।
আনোয়ার হোসেন সদর উপজেলার দাদপুর ইউনিয়নের কাশিপুর গ্রামের আক্কাছ মিয়া বাড়ির নুর আলমের বড় ছেলে।
আনোয়ারের কুল বাগান ঘুরে দেখা যায়, প্রতিটি গাছে ভারত সুন্দরী কুল ও বল সুন্দরী কুল থোকায় থোকায় ঝুলছে। কুলের ভারে মাঠিতে নুয়ে পড়েছে কিছু কিছু গাছের ডাল। রঙটা ঠিক যেন আপেলের মতো সবুজ ও হালকা হলুদের ওপর লাল। কুলের পাশাপাশি বাগানে রয়েছে আখ।
জানা গেছে, দীর্ঘদিন প্রবাসী হলেও আনোয়ারে কৃষি কাজের প্রতি একটু বেশিই আকর্ষণ ছিল। ২০২২ সালের জুন মাসে সুবর্ণচর উপজেলার চরওয়াপদা ইউনিয়নে প্রায় তিন একর পতিত জমিতে ভারত সুন্দরী কুল ও বল সুন্দরী কুল প্রায় ৮০০ চারা রোপন করেন তিনি। প্রথম বছরেই খরচ বাদ দিয়ে লাভের মুখ দেখেন তিনি। এবছর বাগানেই দুই লাখ টাকার কুল বিক্রি করেছেন আনোয়ার। বেপারীরা কুল বাগানে এসে ১০০ টাকা কেজিতে নিয়ে যান কুল গুলো। এবছর আট থেকে ১০ লাখ টাকা কুল বিক্রির সম্ভাবনা আছে।
ওমান প্রবাসী আনোয়ার হোসেন বলেন, আমি ওমান থাকি আজ ১২ বছর। ফল তোলার সময় আমি দেশে আসি। আবার চলে চাই। আমার আগ্রহ ইউটিউব ও ফেসবুক দেখে। এছাড়াও ওমানে যেখানে থাকি সেখানে উত্তরবঙ্গের মানুষ আছে। তাদের পরিবারের অনেকেই কুল চাষ করে। আমি তাদের থেকেও অনেক ধারনা পেয়েছি। দেশে এসে উত্তরবঙ্গে গিয়ে অভিজ্ঞতা জেনে নেই। তারপর ২৮০ শতাংশ পতিত জমিতে কুল চাষ শুরু করি। এবছর আমার আট থেকে দশ লাখ টাকা বিক্রির আশা আছে।
আনোয়ার হোসেন আরও বলেন, আমাদের নোয়াখালীতে ঘরে ঘরে প্রবাসী। আমরা দেশে কিছু না করে সবাই প্রবাস চলে যাই। উত্তরবঙ্গের দিকে এক বাড়িতে হয়তো একজন প্রবাসী। তারা দেশে কিছু করার স্বপ্ন দেখে। আমিও দেশে কিছু করতে চাই এই জন্য প্রবাসী হয়েও উদ্যোগ নিয়েছি। সারা জীবন প্রবাস করা যাবেনা। আর প্রবাসের টাকা দেশে পাওয়া গেলে সেটাই ভালো। আলহামদুলিল্লাহ আমি কৃষি অফিসের সহযোগিতায় নিয়ে ভালো আছি। আমার কুল গুলোর স্বাদ অত্যন্ত সুস্বাদু। এগুলো বেপারীরা চট্রগ্রাম, ঢাকা সহ দেশের বিভিন্ন স্থানে বিক্রি করে। এছাড়াও আমার এই সফলতা দেখে কুলের বাগান করতে অনেকেই উৎসাহিত হয়ে পরামর্শ নিতে আসেন।
আনোয়ারের চাচা কবির মিয়া বলেন, আমার ভাতিজা বিদেশ থেকে আমাকে পরামর্শ দেয়। আমি দেশে সেভাবে পরিচালনা করি। বাগানের প্রতিটি গাছের ফলন অনেক ভালো হয়েছে। নোয়াখালীর মধ্যে এমন সুস্বাদু কুল আর কোথাও দেখি নাই। বাগানের কুল বাগানেই বিক্রি হয়ে যায়।
সুবর্ণচরের বাসিন্দা মো. সেরাজ বলেন, আমি আনোয়ার ভাইয়ের ভাগানের ফল খেয়েছি। অনেক স্বাদ ফলের। উনাকে দেখে আমার আগ্রহ বেড়েছে। বিভিন্ন পরামর্শের জন্য এসেছি। আমরা তার মতো উদ্যোক্তা হতে চাই। তাই আগামীতে এই কুল চাষের জন্য আশাবাদী।
আরেক বাসিন্দা বৃদ্ধা রেজাউল করিম বলেন, আনোয়ার মিয়া যে বাগান করেছে তাতে আমরা খুব খুশী। এমন কুল সুবর্ণচরে আর কখনো দেখি নাই। উনি লাভবান হলে আমাদেরও আনন্দ। তিনি মাঝেমধ্যে আমাদের কুল দেন।
সুবর্ণচর উপজেলার উপ-সহকারী কৃষি অফিসার মো. ইমাম হোসেন বলেন, আনোয়ার হোসেন ও তারা চাচা কবির মিয়া অনেক পরিশ্রম করেছেন। তাই তারা সফল হয়েছেন। আমি যে ফলটা খেলাম এর থেকে স্বাদের ফল বাজারে নাই। আমি কোনোদিন খাই নাই।
সুবর্ণচর উপজেলা কৃষি অফিসার মো. হারুন অর রশিদ বলেন, সুবর্ণচর উপজেলায় প্রবাসী আনোয়ারের বাগানটি অন্যতম। তিনি কুল সংগ্রহের সময় দেশে আসেন। আনোয়ার ও তারা চাচা সফলতার মুখ দেখেছেন। আমার মনে হয় আনোয়ার হোসেন বিদেশের থেকেও বেশি টাকা এই বাগানের মাধ্যমে আয় করবেন। বিদেশের টাকা যদি দেশে অর্জন করতে পারে তাহলে আমরা কৃষি অফিস সব থেকে বেশি খুশি হবো। আমরা বিভিন্ন পরামর্শ দিয়ে আসছি এবং সব সময় তাদের পাশে আছি। আরও যদি উদ্যোক্তা তৈরি হয় তাদের পাশেও আমরা থাকবো।
আপনার মতামত লিখুন :