প্রকাশিত: ২৬ জুলাই, ২০২৫
সর্বশেষ আপডেট : ২৬ জুলাই, ২০২৫

বাংলাদেশের ধর্মীয় স্বাধীনতা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ যুক্তরাষ্ট্রের

বাংলাদেশে ধর্মীয় স্বাধীনতা, সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা এবং মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে যুক্তরাষ্ট্রের একটি গুরুত্বপূর্ণ ফেডারেল সংস্থা ‘ইউনাইটেড স্টেটস কমিশন অন ইন্টারন্যাশনাল রিলিজিয়াস ফ্রিডম’ (ইউএসসিআইআরএফ)। সম্প্রতি তাদের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত এক বিশদ রিপোর্টে এই উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে, যেখানে বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি, সাম্প্রদায়িক সহিংসতা ও সংবিধান সংস্কার নিয়ে নানা দিক আলোচিত হয়েছে।

গত ২০২৪ সালের মে মাসে ইউএসসিআইআরএফ-এর একটি প্রতিনিধি দল ঢাকা সফর করে সরকারের উচ্চপর্যায়ের কর্মকর্তা ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠক করে। সেই সফরের ভিত্তিতেই ২০২৪ সালের জুলাই মাসে তারা একটি বিশ্লেষণধর্মী রিপোর্ট প্রকাশ করে। রিপোর্টটি প্রস্তুত করেন দক্ষিণ এশিয়াবিষয়ক বিশ্লেষক সীমা হাসান। সেখানে বলা হয়েছে, দেশে ছাত্র আন্দোলনের মাধ্যমে রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর আগস্টে অন্তর্বর্তী সরকারের দায়িত্ব নেওয়া সত্ত্বেও ধর্মীয় সহনশীলতা এখনো ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। এ ছাড়া হিন্দু সম্প্রদায়ের ওপর সহিংসতা, সংবিধান পরিবর্তনের বিতর্ক এবং ধর্মনিরপেক্ষতা হ্রাসের ঝুঁকি নিয়েও স্পষ্টভাবে উদ্বেগ জানানো হয়।

রিপোর্টে বলা হয়, ২০২৪ সালের জুলাইয়ে ছাত্র আন্দোলনের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের রাজনৈতিক দৃশ্যপটে বড় পরিবর্তন আসে। আগস্টে নোবেল বিজয়ী অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস সেনাবাহিনীর সমর্থনে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব নেন। যদিও নতুন সরকার রাজনৈতিক ও সাংবিধানিক সংস্কারের কথা বলেছে, তারপরও ইউএসসিআইআরএফ (USCIRF) মনে করে ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত হয়নি।

বিশেষ করে ৫ থেকে ৮ আগস্টের মধ্যে যখন সাবেক প্রধানমন্ত্রী হাসিনা দেশত্যাগ করেন এবং সরকার পতনের সময় দেশে কার্যকর প্রশাসন অনুপস্থিত ছিল—তখন ব্যাপক সহিংসতা ঘটে। পুলিশ রিপোর্ট উদ্ধৃত করে বলা হয়, ৫-২০ আগস্টের মধ্যে দেশে ১,৭৬৯টি সহিংসতার ঘটনা ঘটে, যার মধ্যে ১,২৩৪টি ছিল রাজনৈতিক, ২০টি সাম্প্রদায়িক এবং ১৬১টি ভুয়া অভিযোগের ভিত্তিতে সংঘটিত। এ সময় হিন্দু সম্প্রদায়ের ওপর হামলা চালানো হয়, যেগুলো আ.লীগের সমর্থক ভেবে প্রতিশোধমূলকভাবে পরিচালিত হয়েছিল। এ সময় সংখ্যালঘু মালিকানাধীন অনেক ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ও উপাসনালয় রক্ষা করতে কিছু মুসলিম শিক্ষার্থী ও সাধারণ মানুষ এগিয়ে আসেন।

এছাড়া অন্তর্বর্তী সরকার একটি সংবিধান সংস্কার কমিশন গঠন করে, যার প্রস্তাবে ‘ধর্মনিরপেক্ষতা’ শব্দটি বাদ দিয়ে ‘বহুসংস্কৃতিবাদ’ বা ‘বহুত্ববাদ’ যুক্ত করার সুপারিশ করা হয়। বিএনপি এই প্রস্তাবের বিরোধিতা করে প্রস্তাব করে ‘আল্লাহর ওপর অবিচল আস্থা’ শব্দটি যোগ করার। অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামী ও শিক্ষার্থীদের গঠিত জাতীয় নাগরিক পার্টি (NCP) আংশিক সমর্থন দিয়ে বাংলা শব্দ ‘বহুসংস্কৃতিবাদ’ ব্যবহারের পক্ষে মত দেয়।

চলতি বছরের মে মাসে নারী সংস্কার কমিশন ৪৩৩টি সুপারিশ দেয়, যার মধ্যে একটি ছিল ধর্মনিরপেক্ষ নাগরিক আইন প্রণয়ন। হেফাজতে ইসলাম এই প্রস্তাবের তীব্র বিরোধিতা করে কমিশনকে ‘ইসলামবিরোধী’ আখ্যা দেয় এবং নারী সদস্যদের বিরুদ্ধে কটূক্তি করে। পরে কিছু নারী হেফাজতের বিরুদ্ধে আইনি নোটিশ দেন, যদিও সংগঠনটি পরে ক্ষমা চায়। ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ এক নারী ফুটবল ম্যাচ বন্ধ করতে বাধ্য করে এবং নাদিরা ইয়াসমিন নামের এক নারী অধ্যাপককে হুমকির মুখে কলেজ বদল করতে হয়। এসব ঘটনাও রিপোর্টে উঠে এসেছে।

এ ছাড়া রিপোর্টে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে এখনো ব্লাসফেমি সংক্রান্ত ধারা (দণ্ডবিধি ১৯৫এ) বলবৎ রয়েছে, যেখানে ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত করাকে অপরাধ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। ২০২৩ সালের সাইবার সিকিউরিটি আইনে বলা হয়েছে, ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত করলে সর্বোচ্চ দুই বছরের কারাদণ্ড হতে পারে। এই বিধানগুলো নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেছে ইউএসসিআইআরএফ।

সংস্থাটির মতে, বাংলাদেশে ধর্মীয় সহনশীলতা ও সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে একটি নতুন দৃষ্টিভঙ্গি দরকার। সংবিধান সংস্কারের এই গুরুত্বপূর্ণ সময়ে রাজনৈতিক, ধর্মীয় এবং সামাজিক অংশগ্রহণ নিশ্চিত করলেই কেবল একটি স্থায়ী ও শান্তিপূর্ণ সমাজ গঠন সম্ভব হবে।

আরও পড়ুন