প্রকাশিত: ২ অক্টোবর, ২০২৫
সর্বশেষ আপডেট : ২ অক্টোবর, ২০২৫

নোয়াখালী বিভাগ : শুধু মানচিত্রের রেখা নয়, লক্ষ মানুষের হৃদয়ের প্রতিচ্ছবি – মোহাম্মদ হানিফ

বাংলাদেশের আঞ্চলিক ভূগোলে নোয়াখালী এক উপেক্ষিত রত্নের নাম। মেঘনা, ডাকাতিয়া আর ফেনীর পলিতে গড়ে ওঠা এই জনপদ কেবল কৃষি বা বাণিজ্যের কেন্দ্র নয়; এটি মীর মশাররফ হোসেন, মুহম্মদ শহীদুল্লাহ-ওর বীরশ্রেষ্ঠ রুহুল আমিন  মতো জ্ঞানতাপসদের জন্মভূমি। নোয়াখালীর ইতিহাস বহুধা বিভক্ত হলেও, তার সংস্কৃতি, ভাষা আর আত্মমর্যাদার সুর চিরকাল এক ও অবিচল। আজ এই জনপদের মানুষের কণ্ঠে যে তীব্র ও আবেগপূর্ণ ধ্বনি নোয়াখালী বিভাগ চাই তা কেবল প্রশাসনিক পরিবর্তন নয় এটি যেন এক হাজার বছরের পুরনো ঐতিহ্যের কাছে আধুনিক রাষ্ট্রের দায়বদ্ধতার স্বীকারোক্তি। এটি একটি আত্মপরিচয়ের সন্ধানে বের হওয়া বিশাল কাফেলা।

ঐতিহ্যের ভাষা, পরিচয়ের সংগ্রাম
বাংলাদেশের কোনো অঞ্চলের মানুষকে জানতে হলে, প্রথমেই তার ভাষাকে বুঝতে হবে। ভাষা কেবল যোগাযোগের মাধ্যম নয়, এটি একটি সংস্কৃতির হৃৎপিণ্ড। নোয়াখালী এই ক্ষেত্রে এক দুর্লভ স্বাতন্ত্র্য বহন করে।
দীর্ঘদিন ধরে বৃহত্তর চট্টগ্রাম বিভাগের ছায়াতলে থাকলেও, নোয়াখালীর নোয়াখাইল্লা ভাষা-র ধ্বনিতত্ত্ব পার্শ্ববর্তী অঞ্চলের চেয়ে সম্পূর্ণ ভিন্ন। কুমিল্লা অঞ্চলের ভাষার সারল্য বা চট্টগ্রামের ভাষার দ্রুততা, কোনোটির সঙ্গেই নোয়াখালীর ভাষার মিল নেই। নোয়াখালীর ভাষায় ‘শ’, ‘স’ ও ‘হ’-এর ব্যবহার এবং উচ্চারণে যে বিশেষ ধীর, গভীর ও টানযুক্ত সুর রয়েছে, তা হাজার বছরের জনজীবনের ছবি আঁকে। সমাজবিজ্ঞানীরা ঠিকই বলেছেন ভাষার এই স্বাতন্ত্র্য কখনও কখনও একটি গভীর সাংস্কৃতিক দূরত্বও তৈরি করে। এটি সেই দূরত্ব, যা একই প্রশাসনিক ছাতার নিচে থেকেও মানুষকে বিচ্ছিন্নতার বোধ এনে দেয়।

যখন বৃহত্তর কুমিল্লাকে (কুমিল্লা, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, চাঁদপুর) বিভাগ হিসেবে স্বীকৃতির আলো ঝলমলে মঞ্চে তোলা হলো, তখন নোয়াখালী, লক্ষ্মীপুর ও ফেনীর মানুষের মনে এক ধরনের ‘পরিত্যক্ত’ হওয়ার অনুভূতি জন্ম নিল। এটি যেন পাশের বাড়ির জমকালো উৎসবে নিজেকে কেবল নীরব দর্শক হিসেবে দেখার মতো। তাদের কাছে এটি কেবল ‘পাশের জেলার’ উন্নতি নয়; এটি যেন নিজেদের সুদীর্ঘ ঐতিহ্য এবং সংস্কৃতির প্রতি সরকারি অবহেলার প্রতীকী প্রতিফলন। নোয়াখালী বিভাগ তাই আর কেবল নতুন কার্যালয় তৈরির দাবি নয়; এটি তাদের হাজার বছরের গৌরবকে সম্মান জানানোর দাবি। এই সম্মান, এই স্বীকৃতি না পেলে মানুষের মধ্যে যে হতাশা ও স্বাতন্ত্র্য হারানোর যন্ত্রণা জন্ম নেয়, তা গণতন্ত্রের মূল ভিত্তিকেই দুর্বল করে দেয়।

একটি জনপদের উন্নয়ন তখনই পূর্ণতা পায়, যখন তার প্রশাসনিক সুবিধাগুলো মানুষের দোরগোড়ায় থাকে। নোয়াখালী, লক্ষ্মীপুর ও ফেনী এই তিন জেলার মানুষের জন্য চট্টগ্রাম বিভাগীয় সদর দপ্তর প্রায় দেড়শো কিলোমিটার দূরের পথ। ভাবুন, একজন সাধারণ মানুষ বা একজন প্রবীণ নাগরিককে সামান্য প্রশাসনিক কাজের জন্য  সত্যায়ন, শিক্ষা সংক্রান্ত প্রশাসনিক কাজ, বা একটি বিশেষ স্বাস্থ্যসেবার জন্য এত দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে কতটা সময়, অর্থ ও কষ্টের সম্মুখীন হতে হয়!

এই দূরত্ব কেবল ভৌগোলিক নয়, এটি সেবা পৌঁছানোর দীর্ঘসূত্রিতা। জরুরি কাজ দ্রুত সমাধা না হওয়ার ফলে মানুষের মধ্যে যে হতাশা ও বিচ্ছিন্নতা সৃষ্টি হয়, তা রাষ্ট্রের প্রতি তাদের আস্থাকেও দুর্বল করে। এই প্রশাসনিক দূরত্ব যেন উন্নয়নের পথে শক্তিশালী একটি শেকল। এই শেকল ভেঙে নোয়াখালীকে তার যোগ্য প্রশাসনিক মর্যাদা দেওয়া আজ সময়ের দাবি। একটি বিভাগীয় সদর দপ্তর স্থানীয়ভাবে প্রতিষ্ঠিত হলে সেবা জনগণের দোরগোড়ায় পৌঁছানো সম্ভব হবে, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা কমবে এবং স্থানীয় সমস্যার দ্রুত সমাধান হবে। প্রশাসনিক বিকেন্দ্রীকরণকে শুধু উন্নয়নশীল দেশ নয়, উন্নত বিশ্বও উন্নতির মূলমন্ত্র হিসেবে দেখে।
নোয়াখালী বাংলাদেশের অর্থনৈতিক মানচিত্রে এক নীরব শক্তি। দেশের বৃহত্তম প্রবাসী জনগোষ্ঠীর অন্যতম প্রধান অংশ এই অঞ্চলের মানুষ। ইউরোপ, মধ্যপ্রাচ্য ও আমেরিকায় দিনরাত কঠোর পরিশ্রম করে তারা যে রেমিট্যান্স পাঠান, তা আমাদের জাতীয় অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তি।

এই প্রবাসীরা কেবল অর্থই পাঠান না, তারা সঙ্গে করে নিয়ে আসেন উন্নত বিশ্বের উন্নয়ন ভাবনা, বিনিয়োগের আগ্রহ এবং আধুনিক পেশাগত অভিজ্ঞতা। তারা মনে করেন, যদি নোয়াখালী একটি পূর্ণাঙ্গ বিভাগ হিসেবে স্বীকৃতি পায়, তবে বিদেশি বিনিয়োগের নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হবে। একটি নতুন বিভাগ মানে নতুন অবকাঠামো, নতুন অফিস, নতুন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং স্বাস্থ্যসেবার কেন্দ্র। অর্থাৎ, কর্মসংস্থানের নতুন দরজা। নোয়াখালী বিভাগ গঠন শুধু সরকারি অফিস নয়, এটি আঞ্চলিক অর্থনীতির পুনর্গঠন এবং প্রবাসীদের স্বপ্নের প্রতি সম্মান জানানো। এই অর্থনৈতিক গতি পেলে তা শুধু নোয়াখালীকে নয়, দেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের সামগ্রিক জিডিপিকে শক্তিশালী করবে।

সোনাইমুড়ী বাইপাস অবরোধের দৃশ্যাবলী কেবল কয়েকটি প্রতিবাদী মানুষের সমাবেশ ছিল না, এটি ছিল একটি ঐক্যবদ্ধ হৃদয়ের প্রতিধ্বনি। হাজার হাজার মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ এবং শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ প্রমাণ করে যে এই দাবি কত গভীর ও অপ্রতিরোধ্য। যাত্রীদের সাময়িক দুর্ভোগ সত্ত্বেও আন্দোলনকারীরা যে সংকল্প দেখিয়েছেন, তা একটিই বার্তা দেয় তাঁদের দাবি কোনো ক্ষণিকের সুবিধা নয়, দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন ও আত্মপরিচয়ের মর্যাদা।

বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে থাকা নোয়াখালীবাসীর ভিডিও বার্তা, সোশ্যাল মিডিয়ার সংহতি এসবই প্রমাণ করে যে এটি একটি বিশ্বজনীন আন্দোলন। তারা বলছেন, আমরা রেমিট্যান্স দিয়ে দেশ গড়ি, আর আমাদের জন্মভূমি তার প্রাপ্য প্রশাসনিক সম্মান থেকে বঞ্চিত হবে এ কেমন বিচার?

নোয়াখালী বিভাগ গঠন একটি সময়োপযোগী, বাস্তব এবং ন্যায্য দাবি। সরকারের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা বলছেন, তারা জনগণের প্রতিবাদের ভাষাকে শ্রদ্ধা করেন, কিন্তু কেবল শ্রদ্ধা যথেষ্ট নয় দরকার সক্রিয় সমাধান এবং সংবেদনশীল পদক্ষেপ।

এই দাবি বাস্তবায়নের মাধ্যমে শুধু নোয়াখালী নয়, দেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়নের ক্ষেত্রে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা হবে। নোয়াখালী বিভাগ কেবল একটি প্রশাসনিক ইউনিট নয়, এটি এই অঞ্চলের মানুষের আত্মমর্যাদা, ঐতিহ্য এবং ভবিষ্যতের প্রতীক।

সোনাইমুড়ীর সড়কে দাঁড়িয়ে হাজারো মানুষের স্লোগান এখন আর কেবল আওয়াজ নয়, এটি বাংলাদেশের এক আত্মত্যাগী ইতিহাসের নতুন অধ্যায়ের আহ্বান, যেখানে স্বতন্ত্রতা ও ঐক্য পাশাপাশি হাঁটে। সরকার ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের প্রতি আবেদন এই আবেগকে বুঝুন, মানুষের কণ্ঠস্বরকে সম্মান জানান। নোয়াখালী বিভাগ গঠন কেবল একটি সরকারি সিদ্ধান্ত নয়, এটি লক্ষ মানুষের সম্মানের পুনর্নিমাণ। এই বিভাগ দ্রুত গঠন হলে দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চল থেকে বিকাশের নতুন আলোকবর্তিকা জ্বলে উঠবে, যা দেশকে আরও সমৃদ্ধ করবে।
এই আবেগ ও যুক্তির আলোকেই কি আপনার মনে হয় না, নোয়াখালী বিভাগ এখন কেবল প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নয়, এটি রাষ্ট্র কর্তৃক একটি ঐতিহাসিক এবং সাংস্কৃতিক স্বীকৃতি দেওয়ার এক অবশ্যম্ভাবী মুহূর্ত?আমি আশা করতেছি অবশ্যই কতৃপক্ষের এই বিষয়ে নোয়াখালী বিভাগের পদক্ষেপ নিবেন এ আসা ব্যক্ত করে আজকে বিদায় নিলাম।

লেখক : সাংবাদিক

আরও পড়ুন