প্রকাশিত: ৩০ জুলাই, ২০২৫
সর্বশেষ আপডেট : ৩০ জুলাই, ২০২৫

সোনাইমুড়িতে অবৈধ দখলের থাবায় জনজীবন বিপর্যস্ত!

মোহাম্মদ হানিফ নিজস্ব প্রতিনিধি : সোনাইমুড়ি উপজেলায় এক ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয় নেমে এসেছে। পৌর এলাকার শিমুলিয়া কলেজ রোড থেকে বিমান টাওয়ার পর্যন্ত রামগঞ্জ সড়কের খালের বিশাল অংশ অবৈধভাবে দখল করে একের পর এক দোকানপাট নির্মাণ করা হয়েছে। এই আগ্রাসী দখলদারিত্বের কারণে এলাকার পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা পুরোপুরি ভেঙে পড়েছে, যার ফলস্বরূপ হাজারো মানুষ চরম জলাবদ্ধতার শিকার হচ্ছেন। নাগরিক দুর্ভোগ এখন চরমে পৌঁছেছে, এবং এর প্রভাবে এলাকার কৃষি অর্থনীতি ও জনস্বাস্থ্য গুরুতর হুমকির মুখে।

স্থানীয়দের অভিযোগের তীর প্রভাবশালী চক্রের দিকে। তাদের দাবি, কলেজ রোড থেকে বিমান টাওয়ারের পূর্ব পাশে খালের ওপরের অংশে এই চক্র বেপরোয়াভাবে দখল চালাচ্ছে। একসময় যে খাল শিমুলিয়া গ্রামের প্রাণ ছিল, পানি নিষ্কাশনের মূল পথ ছিল, আজ তার বুকেই গড়ে উঠেছে অবৈধ স্থাপনা আর দোকানপাট। খাল ভরাট করে নির্মাণ করা হয়েছে একের পর এক কাঠামো, যা খালের স্বাভাবিক পানিপ্রবাহকে সম্পূর্ণরূপে রুদ্ধ করে দিয়েছে। এর ফলে সামান্য বৃষ্টিতেই আশেপাশের বসতবাড়ি, ফসলের মাঠ, রাস্তাঘাট  সবকিছুই পানিতে তলিয়ে যাচ্ছে। নিত্যদিনের চলাচল, সন্তানদের স্কুল যাওয়া, এমনকি জরুরি প্রয়োজনেও পানি মাড়িয়ে যেতে হচ্ছে সাধারণ মানুষকে।

শিমুলিয়া গ্রামের বাসিন্দা রফিকুল্লাহ তার ব্যক্তিগত দুর্ভোগের করুণ চিত্র তুলে ধরেছেন। অশ্রুসিক্ত কণ্ঠে তিনি বলেন, আমি বানুয়া গ্রামের বাসিন্দা ছিলাম, কিন্তু সাত বছর ধরে এখানে (বিমান টাওয়ারের পূর্ব পাশে) আমার পৈতৃক সম্পত্তির ওপর কালুয়ায় বসবাস করে আসছি। জীবনটা যেন পানিতেই কাটছে! আমাদের দক্ষিণ এবং উত্তর পাশে আসা-যাওয়ার মতো কোনো রাস্তাই নেই। খালের ওপর দিয়ে যাওয়ার জন্য দুটি সেতু থাকলেও সেগুলো তাদের কোনো উপকারে আসছে না। রফিকুল্লাহর আকুতি, যদি এই খালের উপর থেকে অবৈধ স্থাপনাগুলো উচ্ছেদ করে একটি সেতু নির্মাণ করা হতো, তাহলে আমরা অন্তত একটু শান্তিতে বসবাস করতে পারতাম।

রফিকুল্লাহর জীবন-জীবিকা নির্ভর করে তার গরুর খামারের ওপর। চরম অসহায়ত্ব নিয়ে তিনি বলেন, আমার একটি গরুর খামার আছে। গরু আনা-নেওয়া বা বেচাকেনা আমার জন্য এখন একটা দুঃস্বপ্নের মতো! এই পানির কারণে আমার ব্যবসা পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেছে। আমি চরম বিপদে আছি। নিজ বাড়ির অবস্থা বর্ণনা করে তিনি বলেন, বর্তমানে ছেলে-মেয়ে নিয়ে অনেক বিপদে পড়েছি। নিজের ঘর থেকে বের হলেই পানি ছাড়া আর কিছুই দেখছি না। খালের পশ্চিম পাড়েও অবৈধভাবে দখল করে রাখা হয়েছে। সড়ক ও জনপদের জায়গায় জেলা পরিষদ থেকে লিজ নিয়ে অবৈধভাবে দোকানপাট ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠান তৈরি করা হয়েছে। ওইদিকে যাওয়ার মতো আমার কোনো ব্যবস্থা নেই। তাই আমি প্রশাসনের কাছে জোরালো দাবি জানাচ্ছি, এই অবৈধ দোকানগুলোকে অবিলম্বে উচ্ছেদ করা হোক। বর্তমান বন্যায় জলাবদ্ধতায় আমার অবস্থা খুব খারাপ হয়ে গেছে। এমনকি পূর্ব পাশে কৃষিজমির ফসল আনারও কোনো উপায় নেই।

তিনি আরও যোগ করেন, আগে এই খাল দিয়ে বর্ষার পানি চোখের পলকে নেমে যেত। এখন খাল দখল হয়ে যাওয়ায় আমাদের জীবন দুর্বিষহ হয়ে উঠেছে। সামান্য বৃষ্টিতেই হাঁটু পানি জমে যায়, বাড়িতে পানি ঢুকে যায়, ছেলেমেয়েদের স্কুলে যেতেও বইখাতা সহ সব ভিজে যায়! আমি প্রতিদিন এই পানি দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে আমার পায়ের অবস্থা খারাপ হয়ে গিয়েছে।

শুধু রফিকুল্লাহই নন, এলাকার শত শত কৃষক রোপা আমনসহ বিভিন্ন ফসলের ব্যাপক ক্ষতির শিকার হচ্ছেন। জলাবদ্ধতার কারণে বীজতলা পচে যাচ্ছে, রোপণকৃত ফসল নষ্ট হচ্ছে, যা তাদের জীবন-জীবিকার ওপর মারাত্মক প্রভাব ফেলছে। শুধু কৃষি নয়, এই জলাবদ্ধতা ডেঙ্গু, ডায়রিয়াসহ মশাবাহিত বিভিন্ন রোগবালাইয়ের ঝুঁকিও বাড়াচ্ছে, যা এলাকার জনস্বাস্থ্যের জন্য নতুন এক হুমকি। বিশুদ্ধ পানির অভাব এবং স্যানিটেশন ব্যবস্থার বেহাল দশাও নতুন করে রোগের বিস্তার ঘটাতে পারে।

অবৈধ দখলের এই ভয়াবহ চিত্র দেখেও স্থানীয় প্রশাসনের দীর্ঘদিনের নীরব ভূমিকা প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে। এলাকাবাসী বলছেন, বারবার অভিযোগ জানানো সত্ত্বেও দখলদারদের বিরুদ্ধে কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। তাদের দৃঢ় বিশ্বাস, প্রভাবশালী মহলকে তুষ্ট রাখতে প্রশাসনের কিছু অসাধু কর্মকর্তা এই অবৈধ কর্মকাণ্ডে পরোক্ষভাবে ইন্ধন যোগাচ্ছেন।

তবে আশার কথা, সম্প্রতি সোনাইমুড়ি উপজেলাসহ বিভিন্ন এলাকায় খাল দখলমুক্ত করতে সংশ্লিষ্ট জেলা প্রশাসকদের নির্দেশ দিয়েছেন উচ্চ আদালত। ইতিমধ্যেই
কিছু কিছু এলাকায় উচ্ছেদ অভিযানও চলছে। এই নির্দেশনার পর শিমুলিয়ার এই খালটি দখলমুক্ত হবে কিনা, সেদিকেই অধীর আগ্রহে তাকিয়ে আছে ভুক্তভোগী এলাকাবাসী।
স্থানীয় সচেতন মহল এবং ভুক্তভোগী জনগণ দ্রুত এই খাল দখলমুক্ত করে জলাবদ্ধতা নিরসনের জোর দাবি জানিয়েছেন। তাদের মতে, জরুরি ভিত্তিতে খাল খনন ও অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ না করা হলে ভবিষ্যতে এই এলাকার পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ রূপ নিতে পারে।

জনগণের প্রত্যাশা, স্থানীয় প্রশাসন দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নিয়ে শিমুলিয়ার বাসিন্দাদের এই ভয়াবহ দুর্ভোগ থেকে মুক্তি দেবে। কলেজ রোড থেকে বিমান টাওয়ার পর্যন্ত এবং বিমান টাওয়ার থেকে বাইপাস খালের হারানো ঐতিহ্য ফিরিয়ে আনতে এবং এলাকার পরিবেশ ও জীবনযাত্রার মান উন্নয়নে প্রশাসনের আন্তরিক পদক্ষেপ এখন সময়ের দাবি। সোনাইমুড়ির এই দুর্ভোগের অবসান কি আদৌ হবে?

আরও পড়ুন