
উপজেলা প্রতিনিধি, হাতিয়ায় : হাতিয়ায় উপজেলা প্রকৌশলীর যোগসাজশে সরকারি বরাদ্দের প্রায় এক কোটি টাকা লুটপাটের অভিযোগ উঠেছে। জানা যায়, তিয়া উপজেলার ৮ নং সোনাদিয়া ইউনিয়নের চরচেঙ্গা বাজার জামে মসজিদের অবকাঠামো উন্নয়নের নামে ২০২২-২৩ সালের অর্থ বছরে জিএসআইডি প্রকল্প-১ এর আওতায় ২০ লাখ টাকার বরাদ্ধ হলেও ২০ টাকার কাজ না করে পুরো টাকা তুলে নিল ঠিকাদার। একই প্রকল্পের একই অর্থ বছরের আরও কয়েকটি মসজিদের অবকাঠামো উন্নয়ন বরাদ্দ থেকে প্রায় ৩০ লাখ টাকা লুটপাট করে নিয়ে গেছে বলে স্থানীয় এলাকাবাসী জানান। এছাড়াও একই প্রকল্পে ২য় ধাপে গত ২০২৩-২৪ অর্থ বছরে ৫টি জামে ও ৩টি মন্দির ও ২টি শশ্মানসহ মোট মোট ১০টি প্রতিষ্ঠানের ৫৫ লাখ টাকার অবকাঠামো উন্নয়ন ও সংস্কারের কাজ পায় একই ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান নিগার এন্টার প্রাইজ। খোঁজ নিয়ে জানা যায় সব কয়টি প্রতিষ্ঠানে নামেমাত্র অর্থ দিলেও চরচেঙ্গা বাজার জামে মসজিদের অবকাঠামো উন্নয়ন বরাদ্দের কোন টাকা না দিয়ে অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের নামে বরাদ্দকৃত অর্থসহ মোট দেড় কোটি টাকা লুটপাট করেছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
এছাড়াও উপজেলা ইঞ্জিনিয়ার মোঃ সাজ্জাদুল ইসলামের বিরুদ্ধে বিভিন্ন নামের একাধিক প্রকল্প থেকে ঘুষ, দুর্নীতি, অনিয়ম, সরকারী অর্থ তছরুপ, স্বেচ্ছাচারিতা ও নারী কেলেংকারীর মতো গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। তার বিরুদ্ধে এসব অভিযোগ নিয়ে আজ থাকছে ধারাবাহিক প্রতিবেদনের ২য় পর্ব।
এদিকে হাতিয়া উপজেলা প্রকৌশলী কার্যালয় (এলজিইডি) অফিস সূত্রে জানা যায়, স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় থেকে জিএসআইডি প্রকল্পের ১ (২০২২-২৩) ও ২ (২০২৩-২৪) অর্থ বছরের আওতায় প্রায় মোট ১৮টি প্রতিষ্ঠানের সংস্কার ও অবকাঠামোগত উন্নয়নের জন্য প্রায় ২ কোটি টাকা বরাদ্ধ দেওয়া হয়। তার মধ্যে অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানের সংস্কার ও অবকাঠামোগত উন্নয়নের কাজ পায় ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান নিগার এন্টারপ্রাইজ। তার মধ্যে চরচেঙ্গা বাজার জামে মসজিদ, তমরুদ্দিন বাজার জামে মসজিদ, জবেদ আলী বাজার জামে মসজিদ ও সংলগ্ন কবরস্থান, আল আমিন বাজার জামে মসজিদ, আয়েশা আলী জামে মসজিদ, আলী বাজার জামে মসজিদ সংলগ্ন কবরস্থান, হাতিয়া পৌরসভা শশ্মান মন্দির, পূর্ব গামছাখালী হরি মন্দির, মন্নান নগর ধাঁনসিড়ি রাঁধা কৃষ্ণ মন্দির, মন্নান নগর ধাঁনসিড়ি আশ্রয়ণ, মন্নান নগর ধাঁনসিড়ি আশ্রয়ণ শশ্মানসহ মোট ১৮টি প্রতিষ্ঠানের নামে প্রায় ২ কোটি টাকা বরাদ্ধ হয়।
এ ঘটনায় ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান নিগার এন্টারপ্রাইজ থেকে উপজেলা এলজিইডি ইঞ্জিনিয়ার মোঃ সাজ্জাদুল ইসলাসহ সংশ্লিষ্ঠ কর্মকর্তারা অনৈতিক সুবিধা পাওয়ার সুবাদে সে কোন কাজ না করে সরকারী দেড় কোটি টাকা তুলে নিয়ে গেছে বলে স্থানীয় এলাকাবাসী জানান। এ ঘটনায় সরকারী টাকা অনিয়ম, দুর্নীতি ও প্রতারণার মাধ্যমে আর্তসাৎ করার অভিযোগে দুর্নীতি দমন কমিশনের মাধ্যমে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান নিগার এন্টারপ্রাইজ, উপজেলা প্রকৌশলী সাজ্জাদুল ইসলামসহ যারা জড়িত আছে সঠিক তদন্তের মাধ্যমে সকলকে আইনের আওতায় এনে বিচারের ব্যবস্থা গ্রহণ করার জন্য অনুরোধ করছেন তারা।
এ প্রতিনিধি সরোজমিনে এ বিষয়ে খোঁজ নিতে গেলে বিষয়টি ইঞ্জিনিয়ার মোঃ সাজ্জাদুল ইসলাম জানতে পেরে উক্ত ঠিকাদারকে জানাালে ঠিকাদার গত মাসের ২৩ তারিখে মসজিদের নামীয় একাউন্টে ৫ লাখ পাঠিয়ে দেয়।
এবিষয়ে চরচেঙ্গা বাজার জামে মসজিদের পরিচালনা কমিটির সদস্য, ইমাম, খাদেম, দায়েমী মুসল্লীসহ এলাকার স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, আমরা শুনেছি আমাদের এ মসজিদের অবকাঠামো উন্নয়নের নামে সরকারী ভাবে ২০ লাখ টাকা বরাদ্ধ হয়েছে। বিভিন্ন লোকজনের মুখে কানাঘুষা চলতে থাকলে এ ইউনিয়নের চেয়ারম্যান মেহেদী হাসান ২৩ সালের শেষ দিকে একদিন শুক্রবারে মসজিদে জুমার নামাজ পড়তে এসে মিম্বারে দাড়িয়ে বলেছে যে, “আপনাদের মসজিদের নামে ২০ লাখ টাকা বরাদ্ধ হয়েছে। সরকারী ভ্যাট, ট্যাক্স বাদ দিয়ে ১৭ লাখ টাকা আমার ব্যাংক একাউন্টে আছে। আমি সময়মত মসজিদের ভবন নির্মাণের পাশাপাছি একটি নলকূপ ও একাটি অযুখানা করে দিবো।” এসব কথা বলে তিনি যে গেলেন আর আসলেন না। গত ২ অর্থ বছর পেরিয়ে গেলেও মসজিদের মূল ভবনের কাজ আজও হয়নি। আমরা পরে আরো জানতে পারি মসজিদের মূল ভবনের সামনে এলাকাবাসীর অনুদান ও মসজিদ ফান্ডের টাকায় নির্মিত নতুন ভবন দেখিয়ে সরকারের বরাদ্ধকৃত ২০ লাখ তুলে নিয়ে গেছে ঠিকাদার। অথচ মসজিদের মূল ভবনের চারপাশের দেয়ালে পাটল ধরেছে। বর্ষার সামান্য বৃষ্টির পানিতে মসজিদটি নামাজ পড়া ও ইবাদত করার অনুপযোগী হয়ে গেছে। বলতে গেলে নামে মাত্র চলছে ইবাদতের কাজ। আমরা মসজিদের নামে বরাদ্ধকৃত অর্থ ফেরত চাই। মসজিদের উন্নয়ন কাজ হোক এটা আমরা চাই। এ বিষয়ে আমরা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও জেলা এলজিইডি নির্বাহী প্রকৌশলী মহোদয়ের হস্তক্ষেপ কামনা করছি।
অপরদিকে জবেদ আলী বাজার জামে মসজিদের সাধারণ সম্পাদক ডাঃ হেলাল উদ্দিন জানান, এ মসজিদের অবকাঠামো উন্নয়ন ও কবরস্থান সংস্কারের নামে ১৫ লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। আমরা মাত্র ৭ লাখ টাকা পেয়েছি। বাকি টাকা নাকি ঠিকাদারকে খাওয়ার জন্য দেওয়া হয়েছে।
এছাড়াও আল আমিন বাজার জামে মসজিদের সাধারণ সম্পাদক বলেন, আমাদের মসজিদের নামে ৫ লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে আর আমরা মাত্র ২ লাখ টাকা পেয়েছি। একই অভিযোগ অন্য সকল প্রতিষ্ঠানের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের।
এদিকে অভিযুক্ত নিগার এন্টারপ্রাইজ ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠানের মালিক ও ইউনিয়ন চেয়ারম্যান মোঃ মেহেদী হাসান জানায়, উক্ত কাজটি করে দিবো বলে কথা দিয়ে ছিলাম। কিন্তু করতে পারিনি। বাকি প্রতিষ্ঠানগুলোর বরাদ্দ কিছু কিছু দিয়ে দিয়েছি।
অপরদিকে অভিযুক্ত হাতিয়া উপজেলা এলজিইডির ইঞ্জিনিয়ার মোঃ সাজ্জাদুল ইসলাম জানান, চরচেঙ্গা বাজার জামে মসজিদের নামে ১৫ লাখ টাকা বরাদ্ধ হয়েছে। এছাড়াও সকল প্রতিষ্ঠানের কাজ শেষ হয়ে গেছে বলে ঠিকাদার বিল নিয়ে গেছে। আমি যখন জানতে পেরেছি যে চরচেঙ্গা বাজার জামে মসজিদের অবকাঠামো উন্নয়নের কাজটি হয়নি। তখন আমি নিগার এন্টারপ্রাইজের মালিক মেহেদী হাসানকে বলে দিয়েছি সে যেন বরাদ্ধকৃত টাকাগুলো মসজিদের নামীয় একাউন্টে জমা দিয়ে দেয়। মসজিদ পরিচালনা কমিটি যেন কাজটি করে নিতে পারে।
আপনার মতামত লিখুন :